ঢাকায় ভ্রমণ ভিসায় এসে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে ভয়ংকর কিটামিন ল্যাব চালাচ্ছিলেন তিন চীনা নাগরিক। দেশীয় বাজার থেকে রাসায়নিক সংগ্রহ করে ল্যাবে মাদক প্রক্রিয়াজাত করা হতো এবং তা আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে চীন, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। চক্রটি নজর এড়াতে ডার্ক ওয়েব ও ক্রিপ্টো কারেন্সির ব্যবহার করত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) রাজধানীর উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে এই চক্রের সন্ধান পায়। অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৯ বছর বয়সি বিন, ৬২ বছর বয়সি ইয়াং চুনশেং এবং ৩৬ বছর বয়সি ইউ ঝে। তাদের কাছ থেকে মোট ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিন উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে সেগুনবাগিচায় ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) মো. হাসান মারুফ।
যেভাবে চক্রটি ধরা পড়ল:
ডিজি হাসান মারুফ জানান, ডিএনসির গোয়েন্দা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে মাদক পাচার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছিল। ২৫ মার্চ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার একটি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার অফিসে অভিযান চালিয়ে একটি সন্দেহজনক পার্সেল জব্দ করা হয়।
তল্লাশিতে দেখা যায়, একটি ব্লুটুথ সাউন্ড স্পিকারের ভিতরে ৫০ গ্রাম কিটামিন লুকানো ছিল। তাৎক্ষণিক রাসায়নিক পরীক্ষায় মাদকটির সত্যতা নিশ্চিত হয়। জব্দ পার্সেলের তথ্য বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাজধানীর উত্তরা এলাকায় চক্রের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। রাতে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তিন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।
মহাপরিচালক বলেন, ফ্ল্যাটের একটি কক্ষকে তারা অস্থায়ী ল্যাবে রূপান্তর করেছিল। সেখানে ৬ কেজি ৩০০ গ্রাম কিটামিনসহ বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, ল্যাব সরঞ্জাম, ডিজিটাল স্কেল, প্যাকেজিং যন্ত্রপাতি এবং দেশি-বিদেশি মুদ্রা উদ্ধার করা হয়েছে। চক্রটি এখানেই মাদক প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণ করত এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পাঠাত।
গ্রেপ্তাররা স্বীকার করেছেন, তারা তরল কিটামিন সংগ্রহ করে ল্যাবে পাউডারে রূপান্তর করত। এরপর এটি ইলেকট্রনিক পণ্যের ভিতরে লুকিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানো হতো। লক্ষ্য ছিল, নজরদারি এড়িয়ে মাদক পাচার নিশ্চিত করা।
চক্রটি বিশ্বজুড়ে মাদক বাজার নিয়ন্ত্রণে ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করত। ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে তারা কার্যক্রম আড়ালে রাখত। ‘টিআরওএন’ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে ডিজিটাল মুদ্রায় অর্থ গ্রহণ করা হতো, যা যখন ৪-৫ হাজার ইউএসডিটির সমপরিমাণ হতো, তখন একত্রে উত্তোলন করা হতো।
ডিএনসির ডিজি জানান, আসামিরা এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, নিয়মিত মোবাইল ও সিম পরিবর্তন, ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে নিজেদের অবস্থান গোপন রাখত। ফলে তাদের ওপর নজরদারি চালানো কঠিন ছিল। প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতায় ধীরে ধীরে এই আন্তর্জাতিক চক্রের কার্যক্রম উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে আসা-যাওয়ার সুযোগ নিতেন। মূলত ভ্রমণ ভিসা নিয়ে আসতেন, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরে পুনরায় নবায়ন করতেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ঢাকায় ল্যাব স্থাপন করে মাদক উৎপাদন ও পাচার চালাচ্ছিলেন।
ডিজি জানান, মাদক কাঁচামাল সংগ্রহ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সম্ভাব্য সংযোগ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। আইনি প্রক্রিয়া গুরুত্বসহকারে চলমান রয়েছে।

