মধ্যপ্রাচ্যে সাময়িক যুদ্ধবিরতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করলেও বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তত আরও দুই মাস তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হবে, ফলে সরকারের ব্যয়চাপ অব্যাহত থাকবে।
জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর বড় চাপ পড়েছে। এলএনজি ও জ্বালানি তেল অনেক ক্ষেত্রে আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেড়েছে, পাশাপাশি সরবরাহেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
পেট্রোবাংলা–র চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতি ইতিবাচক হলেও এটি স্থায়ী না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। যুদ্ধের কারণে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী একাধিক এলএনজিবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনতে হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, চুক্তিভিত্তিক এলএনজির দাম তাৎক্ষণিক বাজারদরের ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্দিষ্ট সময়ের গড় দামের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও তার প্রভাব দেশে আসতে সময় লাগে। এ কারণে মে ও জুন মাসেও তুলনামূলক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হতে পারে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থার কারণে বেশ কিছু তেলবাহী জাহাজ আটকে যায়, যার মধ্যে সৌদি আরব থেকে আসা একটি বড় চালানও ছিল। বিকল্প উৎস থেকে আমদানির চেষ্টা করা হলেও তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। তবে ভারত থেকে ডিজেল আমদানি কিছুটা বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন–এর কর্মকর্তারা জানান, এপ্রিলে নির্ধারিত ১৭টি জাহাজের মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েকটির সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। সব চালান সময়মতো না এলে সরবরাহ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়তে পারে।
জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়াও নানা জটিলতায় আটকে আছে। জরুরি ভিত্তিতে বিপুল পরিমাণ তেল সরাসরি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এলসি খোলা ও পারফরম্যান্স গ্যারান্টি সংক্রান্ত সমস্যার কারণে এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। বেশিরভাগ সরবরাহকারী নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করায় আমদানি কার্যক্রম ধীরগতিতে রয়েছে।
অন্যদিকে, বাজারে সরবরাহ সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, যানজট এবং ভোগান্তি নিত্যদিনের চিত্র হয়ে উঠেছে। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দামে তেল বিক্রি ও অবৈধ মজুতের অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলেও পরিস্থিতি সহজ নয়। সেচ মৌসুমে ডিজেলের সংকটে কৃষকদের বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক জায়গায় তেল সরবরাহ ঘাটতি ঘিরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে এলপিজি বাজারেও অস্থিরতা রয়েছে। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির আহ্বান জানিয়েছে, কারণ বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে।
যদিও যুদ্ধবিরতির প্রভাবে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কমেছে, বিশ্লেষকরা বলছেন—এই ইতিবাচক প্রভাব পুরোপুরি পেতে সময় লাগবে। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়া এবং দাম স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত দেশের জ্বালানি খাতে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।

