বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত গত দেড় দশকে ধীরে ধীরে এমন এক বোঝায় পরিণত হয়েছে, যা এখন শুধু জ্বালানি খাতের সমস্যা নয়, বরং পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করা এক দীর্ঘমেয়াদি সংকট। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি, কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ, এবং বিপুল ভর্তুকির দায়—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যৎ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
শুধু গত পাঁচ বছরেই বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হয়েছে। এর অর্থ হলো, এই খাতকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় অর্থের বিশাল অংশ ব্যয় হয়েছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যা দক্ষতা বা টেকসই উন্নয়নের বদলে বরং স্থায়ী আর্থিক চাপ তৈরি করেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এ বোঝা দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণও নেই। অন্তত ২০৪৭ সাল পর্যন্ত হাসিনা সরকারের সময় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দায় বাংলাদেশকে টেনে নিতে হবে।
এই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে পাকিস্তানের উদাহরণ। কারণ বিদ্যুৎ খাতে বর্তমানে বাংলাদেশের যে সমস্যাগুলো দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানও এক সময় প্রায় একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। সেখানে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় অপরিকল্পিতভাবে কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছিল, এবং প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সক্ষমতা তৈরি হওয়ায় কেন্দ্র বসিয়ে রেখেও উচ্চ অঙ্কের অর্থ দিতে হতো। ফলে বিদ্যুৎ খাত দেশটির জন্য বড় ভর্তুকির বোঝায় পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু পার্থক্য তৈরি হয়েছে পরবর্তী পদক্ষেপে।
পাকিস্তান যখন আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ সহায়তা চায়, তখন ভর্তুকি কমানোর শর্ত দেওয়া হয়। সেই চাপকে তারা কেবল সাময়িক আর্থিক সমন্বয় হিসেবে নেয়নি; বরং বিদ্যুৎ খাত পুনর্গঠনের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০২৪ সালে দেশটি বড় ধরনের সংস্কার শুরু করে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করা হয়, কিছু চুক্তি বাতিল করা হয়, এবং উৎপাদন ব্যয় কমাতে আইপিপি নির্মাতা কোম্পানিগুলোকে ৩০ শতাংশ ব্যয় কমানোর শর্ত দেওয়া হয়। তারা রাজি না হলে এনার্জি অডিটের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সব কোম্পানিই সম্মত হয়, এবং ১৪টি বড় বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি সংস্কার করা হয়।
পাকিস্তানের এই পদক্ষেপের একটি বড় দিক ছিল চুক্তির কাঠামো পরিবর্তন। আগে বাংলাদেশের মতো সেখানেও ‘Take or Pay’ ধরনের ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হোক বা না হোক, ক্যাপাসিটি চার্জ দিতেই হবে। পরে চুক্তির শর্ত বদলে ‘Take and Pay’ করা হয়। অর্থাৎ কেবল বিদ্যুৎ কেনা হলেই কোম্পানিকে অর্থ দেওয়া হবে। এই পরিবর্তন শুধু একটি কারিগরি সংশোধন নয়; এটি মূলত রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় কমানোর একটি কাঠামোগত সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি বাতিলও করা হয়। ফলে প্রথম ধাপেই পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ২ দশমিক ৩০ রুপি কমে যায়।
এখানেই শেষ নয়। পাকিস্তান বুঝেছিল, শুধু উৎপাদন ব্যয় কমালেই হবে না; জ্বালানি নির্ভরতার ধরনও বদলাতে হবে। কারণ দেশটির বিতরণ ব্যবস্থা বাংলাদেশের মতোই দুর্বল ছিল। তাই তারা গ্রিড নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুতে জোর দেয়। ২০২১ সালে পাকিস্তানের মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের মাত্র ৪ শতাংশ আসত সৌরবিদ্যুৎ থেকে। কিন্তু রূপটপ সোলার দ্রুত সম্প্রসারণের মাধ্যমে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়ায় মোট চাহিদার ২৫ শতাংশে। মাত্র চার বছরে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি—এটি নিঃসন্দেহে বড় ধরনের রূপান্তর। বর্তমানে দেশটিতে ২০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সোলার থেকে আসে।
এর প্রভাবও ছিল দৃশ্যমান। সৌরবিদ্যুতের বিস্তার জ্বালানির আমদানি নির্ভরতা কমিয়েছে, ফলে বছরে ১২ বিলিয়ন ডলার জ্বালানি আমদানি ব্যয় সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে আইপিপি নির্ভরতা কমে যাওয়ায় গত বছর ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় ১৩ শতাংশ কমে। আর পয়েন্ট টু পয়েন্ট হিসাবে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির তুলনায় গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এ ব্যয় ৩০ শতাংশ কমে যায়। উৎপাদন ব্যয় কমার ফল গ্রাহক পর্যায়েও পৌঁছেছে—পাকিস্তানে কয়েক দফা বিদ্যুতের দামও কমানো হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। একই ধরনের সংকট থাকা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে বিদ্যুৎ খাতে কার্যকর কোনো সংস্কার হয়নি। বরং আগের মডেলই বহাল রাখা হয়েছে। চাহিদা না থাকলেও বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয়েছে। ফলে গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় দাঁড়ায় রেকর্ড ১১ টাকা ৮৩ পয়সা। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) একই সময়ে ৫৫ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা লোকসানের সম্মুখীন হয়। আর সরকারকে বিদ্যুৎ খাতে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়।
এই বাস্তবতা আরও কঠিন হয়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি অনিশ্চয়তায়। চলমান ইরান যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি অস্থিরতা, সরকারের বাজেট ঘাটতি, এবং আইএমএফের ভর্তুকি কমানোর শর্ত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো ছাড়া খুব বেশি বিকল্প এখন দৃশ্যমান নয়। বাস্তবতা হলো, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দাম বাড়ানো শুধু সাময়িক উপশম দিতে পারে; কিন্তু রোগের মূল কারণ দূর করতে পারে না।
এখানে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকার আদানিসহ ৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি পর্যালোচনার জন্য কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু প্রায় দেড় বছর সময় নেওয়ার পরও সে কমিটির প্রতিবেদনে শক্ত পদক্ষেপের সুপারিশ দেখা যায়নি। চুক্তিগুলোর গভীর ও কার্যকর পর্যালোচনা হয়নি বলেও সমালোচনা রয়েছে। নির্বাচিত সরকারের জন্য আদানির বিরুদ্ধে মামলা করার সুপারিশ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে। একইভাবে উৎপাদন ব্যয় বিশ্লেষণ করে ট্যারিফ কমানোর জন্য আরেকটি কমিটি করা হলেও, সেই কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ফলে বোঝা যায়, আলোচনা হয়েছে, কমিটি হয়েছে, সময় গেছে—কিন্তু নীতিগত পরিবর্তন আসেনি।
এখানে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো: বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের উদাহরণ থেকে কিছু শিখতে পারে না?
পাকিস্তান দেখিয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের সংকট অমীমাংসিত নয়। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অস্বস্তিকর হলেও কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত করার মানসিকতা। চুক্তি পুনর্বিবেচনা, অপ্রয়োজনীয় ক্যাপাসিটি চার্জ কমানো, জ্বালানি উৎসের বহুমুখীকরণ, সৌরবিদ্যুতের দ্রুত সম্প্রসারণ, এবং অদক্ষ খরচ কমানো—এসব কোনো কল্পনাপ্রসূত পদক্ষেপ নয়। পাকিস্তান তা বাস্তবে করে দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সমস্যার বড় অংশ শুধু অর্থনৈতিক নয়, নীতিগতও। কারণ যখন সংকটের সমাধান হিসেবে বারবার কেবল ভর্তুকি, দাম বৃদ্ধি, বা নতুন ঋণের কথা আসে, তখন বোঝা যায় মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। অথচ এই কাঠামোই সমস্যা তৈরি করছে। উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও তার কার্যকর ব্যবহার নেই; বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলোর অনেকগুলো অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয়; ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এতে দক্ষতা বাড়ছে না; দাম বাড়ছে, কিন্তু সেবার গুণগত পরিবর্তন তেমন দেখা যাচ্ছে না।
সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—বিদ্যুৎ খাতকে যদি এখনো সংস্কারের আওতায় না আনা হয়, তাহলে এই খাত রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর আরও ভারী বোঝা হয়ে উঠবে। ভর্তুকি বাড়বে, লোকসান বাড়বে, এবং শেষ পর্যন্ত সেই চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর—বিদ্যুতের বিল, পণ্যের দাম, শিল্প উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের মাধ্যমে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গল্প একই জায়গা থেকে শুরু হলেও গন্তব্য এখন ভিন্ন। পাকিস্তান অন্তত সমস্যাকে স্বীকার করে তা মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ফলে প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতির নয়, শাসনব্যবস্থারও: সংকট জানা আছে, উদাহরণও চোখের সামনে আছে, তবু সিদ্ধান্ত আসছে না কেন?
বিদ্যুৎ খাতের এই অচলাবস্থা ভাঙতে না পারলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও বেশি চাপের মুখে পড়বে। আর যদি সত্যিই পরিবর্তন আনা হয়, তবে সেটি শুরু করতে হবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর জায়গা থেকে—চুক্তি, ক্যাপাসিটি চার্জ, ভর্তুকির কাঠামো এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের বাস্তব রোডম্যাপ দিয়ে।

