রাহাদ সুমন,বরিশাল প্রতিবেদক-
৯ মাসের ফুটফুটে শিশু রাকিব। যেন ফোটার আগেই অঙ্কুরে ঝড়ে যাওয়া নিষ্পাপ এক ফুল। প্রাণঘাতি হাম মাত্র ৯ মাস বয়সেই তাকে স্তব্দ করে দিল। প্রকৃতির রূপ, রস, গন্ধ মায়া পিছনে ফেলে অনিন্দ্য সুন্দর রাকিব বাড়ির আঙিনায় অন্ধকার মাটির ঘরে আজ চিরঘুমে।
বরিশালের বানারীপাড়ার চাখার ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর চাখার গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান ও গৃহীনি সুলতানা পারভীনের দুই মেয়ের পর ঘর আলোকিত করে জন্ম নিয়েছিল ছেলে রাকিব। আদরের একমাত্র ছেলেকে ঘিরে হাজারো স্বপ্নের জাল বুনতেন বাবা-মা। রাকিব বড় হয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করে একদিন আলোকিত আদর্শ মানুষ হবেন। বৃদ্ধকালীণ বাবা-মায়ের অবলম্বন হবেন। পৈত্রিক ভিটায় জ্বালাবেন আলো। বাবা-মায়ের পাশাপাশি ছোট্ট ভাইটিকে কোলে নিয়ে আদর করতেন দুই বোন হাবিবা (১০) ও জহুরা (৫)। ভাইকে ঘিরে তাদের দুই বোনের শিশুমনেও ছিল নানা স্বপ্ন। আদরে-সোহাগে প্রিয় ভাইটি দিন দিন বড় হয়ে উঠবে। তারা তিন ভাই-বোন এক সঙ্গে খেলবে,স্কুলে যাবে। ভাইকে খেলনা,চকলেট কিনে দেবে।
কিন্তু বাবা-মা ও দুই বোনের সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল। হাম রোগ শিশু রাকিবকে কেড়ে নিয়ে তাদের সব স্বপ্ন তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে তছনছ করে দিল। হাম রোগে আক্রান্ত রাকিবকে বুধবার (৮ এপ্রিল) সকালে প্রথমে বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে আসা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য দুপুরে তাকে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধিন অবস্থায় বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৪ টার দিকে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে রাকিব মারা যায়। তার এ চলে যাওয়া অঙ্কুরে ঝড়ে পড়া ফুলের মত। রাকিবকে হারিয়ে পরিবারে বইছে শোকের মাতম। বাবা-মা ও দুই বোনের কান্না-আহাজারিতে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে উপজেলার উত্তর চাখার গ্রামের বাড়িতে জানাজা শেষে বাড়ির আঙিনায় কবরস্থানে তাকে চির নিন্দ্রায় শায়িত করা হয়। দাফনের পর বার বার ছেলের কবরের কাছে ছুটে গিয়ে বাবা-মা কান্না-বিলাপ করছেন। তাদের ছেড়ে কিভাবে ছোট্ট শিশু পুত্র একা অন্ধকার কবরে থাকবে এ কথা বলে বিলাপ করেন। তাদের কান্না উপস্থিত সবাইকে অশ্রুসিক্ত করছে। রাকিবের বাবা হাবিবুর রহমান আক্ষেপ করে কান্নাভেজা কন্ঠে বলেন, ছেলের প্রথমে হার্টের রোগ হলে ধারদেনা করে ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করে তোলেন।
হঠাৎ হামে আক্রান্ত হয়ে চোখের সামনে বুকের ধন ছেলেটি মারা গেল। বাবার কাঁধে সন্তানের লাশের চেয়ে ভারী পৃথিবীতে আর কিছু নেই। সময়মত হামের টিকা দিতে পারলে হয়তো ছেলেটির এমন করুন মৃত্যু হতো না। তিনি ছেলের জন্য সবার কাছে দোয়া চান। এদিকে হামে বানারীপাড়ায় ৭ মাস বয়সী সাফওয়ান ও ৪ মাস বয়সী তাবাসসুম নামের আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধিন অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।

