সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের পাশে নির্মিত প্রায় ৫৬ কোটি টাকার আধুনিক ট্রাকচালক বিশ্রামাগার উদ্বোধনের তিন বছর পরও কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। চালকদের ক্লান্তি দূর করে নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি এখন অব্যবহৃত অবস্থায় ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এটিকে বাণিজ্যিকভাবে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যা নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে চালক ও স্থানীয়দের মধ্যে।
ঢাকা–বগুড়া মহাসড়কের সিরাজগঞ্জের পাঁচলিয়ায় ১৩ দশমিক ৫৬ একর জায়গার ওপর এই বিশ্রামাগার প্রকল্পটি গড়ে তোলা হয়। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগস্থলে অবস্থান হওয়ায় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো উদ্যোগ। ২০২০ সালে প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এতে যুক্ত ছিল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার লিমিটেড, রানা বিল্ডার্স প্রাইভেট লিমিটেড এবং মেসার্স সাগর বিল্ডার্স নামের তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর কিছু অসমাপ্ত কাজ রেখেই প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হয়। পরে পুরো প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর। তবে নির্মাণ শেষ হলেও সেটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি বা নিয়মিত ব্যবহার শুরু হয়নি।
প্রায় ৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশ্রামাগারে চালকদের জন্য রাখা হয়েছিল আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। এখানে রয়েছে শতাধিক চালকের থাকার জন্য দ্বিতল ভবন। পাশাপাশি বিনোদন কেন্দ্র, ক্যানটিন, আধুনিক গোসলখানা এবং নামাজের জায়গা। নিরাপত্তার জন্য আনসার ক্যাম্প এবং প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য আলাদা কক্ষও রাখা হয়েছে। বৃহৎ চত্বরে শতাধিক ট্রাক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা, যানবাহন মেরামতের ওয়ার্কশপ এবং ওয়াশজোনও তৈরি করা হয়েছে। সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য প্রকল্প এলাকায় দুটি কৃত্রিম লেক এবং চারপাশে সবুজায়ন করা হয়েছে।
প্রকল্পের শুরুতে ঘোষণা ছিল, চালকরা এখানে বিনামূল্যে সব ধরনের সেবা পাবেন। শুধু ক্যানটিনের খাবারের বিল পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এখন প্রকল্পটিকে লাভজনক ব্যবস্থায় রূপান্তর করে বার্ষিক ভিত্তিতে লিজ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, এই ইজারা পাওয়ার জন্য স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের সক্রিয়তা রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বিশ্রামাগারের মূল ভবনের অধিকাংশ কক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। দরজা-জানালার কাচ ভাঙা অবস্থায় রয়েছে। ভেতরের আসবাবপত্র এবং মূল্যবান বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। খোলা জায়গায় এখন গবাদিপশু বাঁধা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে এবং নানা ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ ঘটে। দূরপাল্লার চালকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর পর বিশ্রামের জন্য নিরাপদ জায়গার প্রয়োজন হলেও এমন সুযোগ তারা পাচ্ছেন না।
দিনাজপুরের হিলি থেকে ঢাকাগামী ট্রাকচালক লিয়াকত আলী বলেন, ‘৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার গাড়ি চালাতে হয়। অনেক সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এ সময় বিশ্রামের খুব প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বিশ্রামের জন্য নিরাপদ কোনো জায়গা পাওয়া যায় না। সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে এটি বানালেও অজ্ঞাত কারণে আমরা এটি ব্যবহার করতে পারছি না। এটি চালু হলে আমাদের মতো দূরপাল্লার পণ্যবাহী ট্রাকের চালকদের অনেক উপকার হতো।’
স্থানীয় ট্রাকচালক উসমান আলী বলেন, ফাঁকা পড়ে থাকায় বিশ্রামাগারটির অনেক জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যার পর এখানে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। দ্রুত এটি চালু করা জরুরি।
সিরাজগঞ্জ ট্রাক শ্রমিক সমিতির আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াহাব বলেন, বিশ্রামাগারটি মূলত দূরপাল্লার ট্রাকচালকদের জন্য বিনামূল্যে সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল। এটি লিজ দেওয়া হলে চালকরা সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হবেন এবং কোনো সেবা পেলেও উচ্চ খরচের কারণে তা ব্যবহার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। সংগঠনটি লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমরান ফারহান সুমেল বলেন, প্রকল্পটিকে সেবামূলক খাত থেকে বাণিজ্যিক লিজ ব্যবস্থায় নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবে এখনো কাউকে লিজ দেওয়া হয়নি। নির্মাণ শেষ হলেও চালু না হওয়া এই বিশ্রামাগার এখন একদিকে অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার প্রতীক, অন্যদিকে সরকারি বড় বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্নও তুলছে স্থানীয়দের মধ্যে।

