রাজশাহীতে নির্মাণ শেষ হওয়ার প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও ২০০ শয্যার সরকারি শিশু হাসপাতাল এখনো চালু হয়নি। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক জটিলতা ও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালটি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি। এদিকে বিদ্যমান হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপের ফলে শিশুদের চিকিৎসা পরিস্থিতি দিন দিন আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
নগরীর টিবি পুকুর এলাকায় প্রায় আড়াই একর জমির ওপর চারতলা এই হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের জুনে। প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান ও এমআরআইসহ আধুনিক সব সুবিধা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল কাঠামো অনুমোদন না হওয়ায় হাসপাতালটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা যায়নি।
এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু রোগীর চাপ ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০০ শয্যার বিপরীতে সেখানে প্রায় এক হাজার শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে অনেক রোগীকে একই বেড ভাগাভাগি করে থাকতে হচ্ছে, আবার অনেককে করিডোরেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এই অস্বাভাবিক চাপ চিকিৎসা সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সম্প্রতি আইসিইউ সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত মার্চ মাসে আইসিইউ বেডের অভাবে ২২৯ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ৯১ জনই শিশু। অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাওয়ার আগেই অপেক্ষমাণ অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্মাণ শেষ হওয়ার পর ভবনটি হস্তান্তরের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখনো কেউ দায়িত্ব নেয়নি। ফলে হাসপাতাল ভবনটি ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে আছে। এমনকি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব ব্যবস্থায় পাহারা দিতে হচ্ছে, তবুও কিছু যন্ত্রপাতি চুরির ঘটনাও ঘটেছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া প্রশাসনিক দায়িত্ব নির্ধারণ সম্ভব নয়। জনবল কাঠামো অনুমোদনের জন্য বারবার চিঠি দেওয়া হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য বিভাগের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানায়, হাসপাতালটি চালুর দায়িত্ব একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। ফলে কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ থমকে আছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পূর্ণ প্রস্তুত একটি হাসপাতাল বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা প্রশাসনিক ব্যর্থতার স্পষ্ট উদাহরণ। তাদের ভাষায়, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে জনবল নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একটি অঞ্চলে শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যসেবা না থাকলে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। রাজশাহীর বর্তমান পরিস্থিতি সেই ঝুঁকিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর আকার ধারণ করতে পারে।

