ব্যাংক রেজোল্যুশন আইনে একীভূত হওয়া দুর্বল ব্যাংকের পুরোনো শেয়ারধারীদের আবারও মালিকানায় ফেরার সুযোগ যুক্ত করার উদ্যোগকে আত্মঘাতীমূলক বলে মন্তব্য করেছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এ বিধান কার্যকর হলে জবাবদিহি ছাড়াই চিহ্নিত লুটেরাদের পুনর্বাসনের পথ তৈরি হবে, যা পুরো ব্যাংকিং খাতকে আবারও অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
আজ সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি এ উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিবৃতিতে বলা হয়, ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং সুশাসনের ঘাটতি দূর করার পরিবর্তে দায়মুক্তি ও বিচারহীনতার চর্চা আবারও চালু করা হচ্ছে। এতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এ এমন বিধান ছিল, যেখানে ব্যাংকের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সব অর্থ ফেরত দিলেও মালিকানায় ফিরে আসার সুযোগ ছিল না। তবে সংশোধনের মাধ্যমে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬’-এ নতুন করে সংযোজিত ১৮(ক) ধারায় সেই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়েছে।
টিআইবির মতে, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের বিচারের আওতায় আনার পরিবর্তে কার্যত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সংস্থাটির বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই উদ্যোগ কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের মতোই দায়মুক্তির সংস্কৃতি অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এতে ব্যাংক খাত সংস্কারের পরিবর্তে পুরোনো অনিয়মকারীদের পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাস্তবে ব্যাংক খাতের লুটেরাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা দূরে থাক, বিশালভাবে পুরস্কৃত করা হলো, যা আত্মঘাতীমূলক। সরকারের এ সিদ্ধান্ত হতাশাজনক হলেও অবাক করার মতো তেমন কিছু নেই। কর্তৃত্ববাদের পতনের অর্থ ব্যাংক খাতে ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবরদখলের অবসান নয়। বরং ‘উইনার টেইকস অল’ অনুযায়ী নীতিদখলের পালাবদলের মাধ্যমে চোরতন্ত্রের সাময়িক বিরতির পর পুনর্বাসনের পথ সুগম করেছে সরকার। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের চরম বিতর্কিত সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা।”
তিনি আরও বলেন, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর আগের মালিকেরা ছিলেন এই খাতের লুটপাটের অগ্রগামী। কিন্তু তারা কীভাবে এমন ‘শুদ্ধতা’ অর্জন করলেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “একই ব্যাংকের শেয়ার ও সম্পদ পুনরায় গ্রহণের জন্য সরকার নির্ধারিত অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ জমা দিতে হবে। বাকি ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ২ বছরে ১০ শতাংশ সুদসহ পরিশোধ করতে হবে। পাশাপাশি নতুন মূলধন জোগান, বিদ্যমান মূলধন ঘাটতি পূরণ, আমানতকারী ও পাওনাদারের দায় শোধ, সরকারের কর ও রাজস্ব পরিশোধ, ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং কমপ্লায়েন্স কাঠামো পুনর্গঠনের মতো দায়িত্বও পালন করতে হবে। এসব বাস্তবে কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারের কাছে আছে কি?” তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, কোন মানদণ্ডে পুনর্দখলের বিনিময়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে টিআইবি সতর্ক করে বলেছে, পুরোনো শেয়ারধারীদের জবাবদিহি নিশ্চিত না করে মালিকানা ফেরানোর উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে ব্যাংকিং খাতে কাঙ্ক্ষিত গুণগত পরিবর্তন আসবে না।
এ প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকার ব্যাংক সচল রাখা, আমানত সুরক্ষা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার নামে দুর্নীতিসহায়ক নতুন বিধান যুক্ত করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সংসদে পাস হওয়া এই আইন কি নির্বাচনী ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের অঙ্গীকার পূরণে সহায়ক হবে, নাকি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় নেওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত—সেটিই প্রশ্ন।” তিনি সরকারের প্রতি এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান।

