গ্রীষ্মের শুরুতেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আবারও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা, আর সেই চাহিদা মেটাতে না পেরে শুরু হয়েছে ব্যাপক লোডশেডিং। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ—প্রতিদিন ১০ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন প্রায় অচল হয়ে পড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ এপ্রিল ২০২৬) দুপুর ১টার দিকে দেশে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। এ সময় মোট চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩২৪ মেগাওয়াট। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বড় পরিসরে লোডশেডিং দিতে হয়েছে।
যদিও বিকেলের দিকে তেলভিত্তিক কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হলে ঘাটতি কমে প্রায় ৯০০ মেগাওয়াটে নেমে আসে, তবুও সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়।
এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে কয়লা ও তেলের ঘাটতি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লা ও ফার্নেস অয়েল কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি হঠাৎ করে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়াও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট উৎপাদন করছে। আরেকটি বড় কেন্দ্রও স্বাভাবিক উৎপাদনের তুলনায় অনেক কম বিদ্যুৎ দিচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুৎ খাতে বকেয়া অর্থের পরিমাণও উদ্বেগজনক। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। এই অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কেন্দ্র ঠিকমতো জ্বালানি আমদানি করতে পারছে না, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকের কিস্তি বা কর্মচারীদের বেতন দিতেও সমস্যায় পড়ছে।
ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম সংকটাপন্ন। উৎপাদন ক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি সংকটের কারণে তারা পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। বর্তমানে এসব কেন্দ্রের জ্বালানি মজুত দ্রুত কমে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে আরও বড় সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্ববাজারেও জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। ফার্নেস অয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। আগে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ২০ টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে ২৬ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়ছে কয়েক দিক থেকে—চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বকেয়া বিল এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, মে মাসে তাপমাত্রা আরও বাড়লে বিদ্যুৎ ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াটের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এরই মধ্যে গ্রামাঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দিনে-রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। টানা লোডশেডিংয়ের কারণে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে, পাশাপাশি কৃষি ও ছোট ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বকেয়া পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ না নিলে সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

