স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে নিত্যপণ্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী দামে পৌঁছে দিতে গিয়ে বড় অঙ্কের আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়েছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকেই (জুলাই–সেপ্টেম্বর) সংস্থাটির ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ৬৮৪ কোটি টাকার বেশি।
এই ঘাটতি পূরণে সরকারি ভর্তুকি প্রয়োজন বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থ বিভাগকে সম্প্রতি একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সেখানে বলা হয়, টিসিবির ঘাটতি মেটাতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮৪ কোটি ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৩১ টাকা। সিএ ফার্ম এম এ ফজল অ্যান্ড কোং-এর নিরীক্ষার পর এই হিসাব চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং ভর্তুকির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বাজারে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখতে টিসিবির মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডধারী পরিবারের কাছে ভোজ্য তেল, চিনি, মসুর ডাল ও ছোলা বিক্রি করা হচ্ছে সাশ্রয়ী মূল্যে। একই সঙ্গে খোলা ট্রাকের মাধ্যমেও এসব পণ্য ভর্তুকি দামে বিক্রি করা হয়। বাজারদরের তুলনায় কম দামে পণ্য সরবরাহ করাই এই আর্থিক ঘাটতির মূল কারণ।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, টিসিবির নিজস্ব কোনো স্থায়ী তহবিল নেই। ফলে পণ্য কেনার জন্য সংস্থাটিকে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির বিপরীতে ব্যাংক থেকে ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ সুদে এলটিআর ঋণ নিতে হয়। কম দামে পণ্য বিক্রির পাশাপাশি উচ্চ সুদের ঋণ ও ডিলারদের পরিচালন ব্যয় মিলিয়ে ভর্তুকির চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও টিসিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে সংস্থাটির ভর্তুকির পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে যেখানে ভর্তুকি ছিল মাত্র ৮২ কোটি টাকা, সেখানে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকায়। পরবর্তীতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কিছুটা কমে প্রায় ১ হাজার ৪১২ কোটি টাকায় নামে। তবে বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে এই ভর্তুকি প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় হয় ডাল, ভোজ্য তেল ও চিনির মতো নিত্যপণ্যে। অতীতে দেখা গেছে, এসব পণ্য অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে সরবরাহ করা হয়েছে।
বাজার স্থিতিশীল রাখার চ্যালেঞ্জের বিষয়ে টিসিবি জানায়, আগে মোট চাহিদার মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ পণ্য সংস্থাটির মাধ্যমে সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে এই পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামের ওঠানামাও ভর্তুকির চাপ বাড়িয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল ও সহনীয় রাখতে টিসিবিকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। সময়মতো অর্থ ছাড় করা হলে ব্যাংকের দায় পরিশোধ এবং ভবিষ্যৎ পণ্য ক্রয় কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছে মন্ত্রণালয়।
বর্তমানে ফ্যামিলি কার্ডধারীরা প্রতি মাসে ২ লিটার ভোজ্য তেল, ২ কেজি মসুর ডাল ও ১ কেজি চিনি সাশ্রয়ী দামে কিনতে পারছেন। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিসিবির এই কার্যক্রমকে সরকারের অন্যতম সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

