আজ শুক্রবার পবিত্র আশুরা। ১৪৪৮ হিজরি সনের ১০ মহররম উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে দিনটি পালন করা হচ্ছে। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি একদিকে যেমন মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের স্মারক, অন্যদিকে ত্যাগ, ন্যায় এবং সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মোৎসর্গের এক অবিস্মরণীয় প্রতীক। এ উপলক্ষে দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
‘আশুরা’ শব্দের অর্থ ‘দশম’। মহররম মাসের দশম দিনে এ দিবস পালিত হওয়ায় এর নাম হয়েছে আশুরা। ইসলামের ইতিহাসে এই দিনের গুরুত্ব বহু ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিশেষ করে হজরত মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি লাভের ঘটনাটি মুসলমানদের কাছে আল্লাহর অসীম অনুগ্রহের স্মারক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সহিহ হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মদিনায় এসে দেখেন, ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। কারণ জানতে চাইলে তারা বলেন, এই দিনেই আল্লাহ তাআলা হজরত মুসা (আ.) ও বনি ইসরাঈলকে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হজরত মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মুসলমানরাই অধিক হকদার। এরপর তিনি নিজে আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন। সহিহ বুখারির ২০০৪ নম্বর হাদিসে এ ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও নির্দেশ দিয়েছেন, ইহুদিদের অনুসৃত পদ্ধতি থেকে ভিন্নতা আনতে আশুরার রোজার সঙ্গে মহররমের ৯ অথবা ১১ তারিখেও একটি অতিরিক্ত রোজা রাখা উত্তম। তাই প্রতিবছরের মতো এবারও অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম নফল রোজা পালন করছেন।
তবে আশুরার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাবিধুর ঘটনাও। ৬১ হিজরির ১০ মহররম ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.), তাঁর পরিবারের সদস্য এবং সঙ্গীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে গিয়ে শাহাদাতবরণ করেন। কারবালার এই আত্মত্যাগ যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছে।
পবিত্র আশুরা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক বাণীতে বলেছেন, এই দিনের শিক্ষা মানুষকে অন্যায়, অবিচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে উদ্বুদ্ধ করে। সত্য, ন্যায় এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আশুরার আদর্শ অনুসরণের আহ্বানও জানান তিনি।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বাণীতে বলেন, ইসলামে বিভেদ, বিদ্বেষ কিংবা হানাহানির কোনো স্থান নেই। আশুরার চেতনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজে সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান তিনি।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদে কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ, দোয়া ও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিয়া সম্প্রদায় কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে তাজিয়া মিছিলসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কর্মসূচি পালন করছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করেছে।
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, আশুরা কেবল একটি ঐতিহাসিক দিন নয়; এটি সত্য, ন্যায়, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থার প্রতীক। তাই এই দিনের মূল শিক্ষা কেবল রোজা পালন বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজজীবনে নৈতিকতা, মানবিকতা এবং ন্যায়ের চর্চার মধ্য দিয়েই আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য বাস্তবায়িত হতে পারে।

