ছাত্ররাজনীতি দিয়ে শুরু, এরপর শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রী এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে এবার রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
২০ আগস্ট ২০২৬, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাক্ষী হলো বাংলাদেশ। জাতীয় সংসদ সদস্যদের ভোটে বেসরকারি ফলাফলে বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন।
জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত ভোটে মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে মির্জা ফখরুল পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী ও এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। ছয়জন সংসদ সদস্য ভোটদানে বিরত ছিলেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী থাকায় আর ভোটের প্রয়োজন হয়নি। ফলে সাড়ে তিন দশক পর এবার আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দুই প্রার্থীর মধ্যে সরাসরি ভোট হলো।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
পরে সরকারি দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে আবার শিক্ষকতায় ফিরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেন।
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর বিএনপিতে যোগ দিয়ে ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
দলের সাংগঠনিক দায়িত্বেও দ্রুত উঠে আসেন তিনি। ২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ২০১১ সালে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং ২০১৬ সালে বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ১৭ বছর দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বে থেকে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বড় ভূমিকা রাখেন তিনি।
২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর আগামীকাল ২১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে তাঁর শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। শপথের পর আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন মির্জা ফখরুল।
নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুল সুখী, সমৃদ্ধ ও জনকল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি প্রান্তিক মানুষ, শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে পাশে থাকা মানুষ, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
তবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার মুহূর্তে তাঁর কণ্ঠে ছিল আবেগও। তিনি বলেন, জীবনের অনেক কিছুই তিনি মিস করবেন। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, পৌর প্রশাসন, সংসদ ও মন্ত্রিসভা—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় এখন বঙ্গভবনে। ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর হাতে উঠল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব।

