সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন খরচ চালাতে এখন অনেক শিক্ষককে নিজের বেতন থেকে টাকা দিতে হচ্ছে। স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (SLIP) ফান্ডের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ায় খাতা-কলম, পরীক্ষার কাগজপত্র, শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে ছোটখাটো মেরামতের খরচও অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে।
শিক্ষকদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়ার সুযোগ নেই। অন্যদিকে বিদ্যালয়ের নিয়মিত প্রয়োজন মেটাতে যে সরকারি সহায়তা দেওয়া হতো, সেটিও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। ফলে অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালাতেই সমস্যায় পড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে ২০১০ সালের পর থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা ফি নেওয়া বন্ধ করা হয়। এরপর বিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে SLIP ফান্ড চালু করা হয়। এই ফান্ড থেকে পরীক্ষার আয়োজন, শিক্ষা উপকরণ কেনা, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও ছোটখাটো সংস্কারের কাজ করা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই বরাদ্দ কমে যাওয়ায় বিদ্যালয়গুলোর আর্থিক চাপ বেড়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যার ভিত্তিতে বিদ্যালয়গুলোকে SLIP ফান্ড দেওয়া হচ্ছে। ৫০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয় পাচ্ছে ৭ হাজার ৫০০ টাকা, ৫১ থেকে ৩০০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পাচ্ছে ১৫ হাজার টাকা, ৩০১ থেকে ৬০০ শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পাচ্ছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা, ৬০১ থেকে ১ হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পাচ্ছে ৩০ হাজার টাকা এবং এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকা বিদ্যালয় পাচ্ছে সর্বোচ্চ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা।
শিক্ষকদের দাবি, কয়েক বছর আগেও অনেক বিদ্যালয় বছরে ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ পেত। বর্তমানে সেই তুলনায় বরাদ্দ অনেক কমে গেছে, ফলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজাম উদ্দিন মজুমদার জানান, আগে বিদ্যালয়টি প্রায় এক লাখ টাকা বরাদ্দ পেলেও এবার তা কমে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় নেমে এসেছে। ভ্যাট কাটার পর হাতে থাকে প্রায় ১০ হাজার টাকা, যা দিয়ে নিয়মিত খাতা-কলমসহ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের খরচ মেটানো সম্ভব নয়।
একই উপজেলার আন্ধারমানিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন শিহাব বলেন, গত বছর বরাদ্দ ছিল ১৫ হাজার টাকা, যা কর্তনের পর প্রায় ১২ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। এই অর্থ দিয়ে বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র, কলম ও ডাস্টার কেনার খরচ চালানো কঠিন। প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরিতেই উপজেলা শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। তাই অনেক সময় তাকে নিজের বেতন থেকে টাকা দিতে হয়।
চার উভূতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম জানান, প্রতিটি সাময়িক পরীক্ষায় প্রায় ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। পরীক্ষার খরচ মেটানোর পর বিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য খুব সামান্য অর্থ অবশিষ্ট থাকে।
পাবনার চাটমোহরের দাথিয়া কয়রাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবদুল আজিজ বলেন, বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে তিনটি পরীক্ষার খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রয়োজন হলে শিক্ষকদের নিজেদের অর্থ দিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে হয়।
নওগাঁ সদর উপজেলার ভীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ফিরোজ করিম জানান, আগে SLIP ফান্ডের অর্থ দিয়ে ফ্যান, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ বিভিন্ন জিনিস মেরামত করা যেত। এখন অনেক সময় একটি নষ্ট বাল্ব পরিবর্তনের অর্থও পাওয়া যায় না।
SLIP ফান্ডের অর্থ সংকটের কারণে চলতি বছরের জুনে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় শ্রেণিভেদে ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত পরীক্ষার ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে ১৬ জুন তা প্রত্যাহার করা হয়। ফলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বর্তমানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নিতে পারছে না।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (PEDP4) শেষ হওয়ায় বর্তমানে SLIP ফান্ড ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিবর্তনের কাজ চলছে। বিদ্যালয়গুলোকে সব ধরনের খরচের হিসাব ও ভাউচার সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন PEDP5 কার্যক্রম শুরু হলে ফান্ড ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, SLIP ফান্ডের ব্যবহার সঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। তবে কোনো অনিয়মের কারণে যেন সৎ শিক্ষকরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মানজুর আহমদ মনে করেন, বিদ্যালয় পর্যায়ে আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। তবে দুর্নীতি বা অনিয়মের দায় ভালো শিক্ষকদের ওপর চাপানো উচিত নয়।
শিক্ষকদের মতে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

