ঢাকার মেট্রোরেলে একজন মানুষ অসুস্থ বোধ করে সামান্য বসার জায়গা চেয়েছিলেন। পাননি। দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই তিনি স্ট্রোক করে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান।
ঘটনার সারকথা
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নাজিবুর রহমান ২৪ অক্টোবর দুপুরে শাহবাগ থেকে উত্তরা ফেরার পথে শেওড়াপাড়া স্টেশনের কাছে পৌঁছালে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছেলের বর্ণনায়, তিনি তখন আশপাশের যাত্রীদের কাছে আসন চান, কিন্তু কেউ ছেড়ে দেননি।
যে সান্ত্বনাটুকু মিলল না
বসার সুযোগ পেলে তিনি বাঁচতেন কি না, তা কেউ জানে না। চিকিৎসকেরাও হয়তো নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত: জীবনের শেষ মুহূর্তে একজন মানুষ অন্তত এই সান্ত্বনা নিয়ে যেতে পারতেন যে চারপাশে মানবিকতা এখনো বেঁচে আছে। সেই সান্ত্বনাটুকুও তাঁকে দেওয়া হলো না। একজন শিক্ষক, যিনি সারাজীবন জ্ঞান বিলিয়েছেন, তাঁর শেষ অনুরোধটুকুও রাখা গেল না, এর চেয়ে বেদনার আর কী হতে পারে?
ছেলের সংযম, আমাদের লজ্জা
ছেলের প্রতিক্রিয়া আরও স্তব্ধ করে দেয়। ফেসবুকে তিনি কারও বিরুদ্ধে ক্ষোভ ঝাড়েননি। বলেছেন, তাঁর কোনো রাগ বা অভিমান নেই। শুধু অনুরোধ করেছেন, বয়স্ক মানুষকে যেখানে যে অবস্থায় দেখি, বন্ধুর মতো আচরণ করি। যাঁকে আজ উপেক্ষা করছি, তিনি আমার বাবা না হলেও অন্য কারও বাবা। বাবাকে হারানোর শোকের মধ্যেও এমন সংযম ও শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতা আমাদের লজ্জা আরও বাড়ায়।

অবকাঠামো এসেছে, নাগরিক আচরণ আসেনি
প্রশ্ন হলো, একজন বৃদ্ধকে আসন না ছেড়ে বসে থাকায় কীসের বীরত্ব? মেট্রোরেল আমাদের আধুনিক নগরজীবনের গর্ব। যানজটের শহরে এটি স্বস্তির নাম। অথচ অবকাঠামো আধুনিক হলেও আমরা কি আধুনিক নাগরিক হয়ে উঠতে পেরেছি? মোবাইল ইন্টারনেট এসেছে, কিন্তু ডিজিটাল সাক্ষরতা আসেনি, ফলে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তেমনি মেট্রোরেল এসেছে, কিন্তু গণপরিবহনের সৌজন্য ও কাণ্ডজ্ঞান আমরা কাউকে শেখাইনি। প্রযুক্তি আমদানি করা যায়, নাগরিক আচরণ যায় না; তা গড়ে তুলতে হয় পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজের ভেতর থেকে।
এই ঘটনা কেবল একজন মানুষের নয়। প্রতিদিন গণপরিবহনে আমরা অসংখ্য বৃদ্ধ, অসুস্থ ও গর্ভবতী মানুষকে দাঁড়িয়ে যেতে দেখি, অথচ কেউ ফিরে তাকাই না। স্ট্রোকের মতো জরুরি অবস্থায় প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। বসতে দেওয়া, পানি এগিয়ে দেওয়া কিংবা কর্মীদের খবর দেওয়ার মতো ছোট উদ্যোগও বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। সহযাত্রীদের কেউ একজন এগিয়ে এলে হয়তো বাকিরাও আসতেন; মানবিকতা অনেক সময় একজনের সাহসের অপেক্ষায় থাকে।
করণীয়
- সচেতনতা: স্টেশন ও ট্রেনে ঘোষণা, পোস্টার ও ডিজিটাল স্ক্রিনে নিয়মিত প্রচার চালাতে হবে, যাতে অগ্রাধিকার আসনের গুরুত্ব সবার মনে থাকে।
- আসন নির্দেশনা: বয়স্ক, অসুস্থ, গর্ভবতী ও প্রতিবন্ধী যাত্রীর আসন স্পষ্টভাবে চিহ্নিত থাকা এবং তা মানা হচ্ছে কি না, কর্তৃপক্ষকে তা দেখতে হবে।
- দ্রুত সাড়া: জরুরি অবস্থায় যাত্রীরা কীভাবে সাহায্য চাইবেন এবং কর্মীরা কত দ্রুত সাড়া দেবেন, তার প্রশিক্ষণ থাকতে হবে। স্টেশনে প্রাথমিক চিকিৎসার প্রস্তুতিও জরুরি।
- শিক্ষা: পরিবার, স্কুল ও গণমাধ্যমে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে বড়দের জায়গা ছেড়ে দেওয়া দয়া নয়, নাগরিক দায়িত্ব।
সবার আগে দরকার বিবেক
নিয়ম ও প্রচারের আগে দরকার বিবেক। কোনো আইন কাউকে বাধ্য করতে পারে না পাশে দাঁড়ানো অসুস্থ মানুষটির মুখের দিকে তাকাতে। সেই তাকানোটা আসে ভেতর থেকে। ব্যস্ততা, ক্লান্তি কিংবা মোবাইলের পর্দায় ডুবে থাকা কোনোটাই এই উপেক্ষার অজুহাত হতে পারে না। চারপাশে তাকানোর অভ্যাস হারালে আমরা শুধু যাত্রী থেকে যাব, মানুষ থাকব না।
মানুষ নানা কারণে মারা যায়, তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু মনুষ্যত্বের মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। অধ্যাপক নাজিবুর রহমানের মৃত্যু আমাদের জন্য একটি প্রশ্ন রেখে গেছে: পরের বার যখন কেউ আসন চাইবেন, আমরা কি উঠে দাঁড়াব?

