বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর দায়িত্ব নিয়েছেন মাত্র নয় মাস আগে। অথচ এই স্বল্প সময়ে তিনি কাটিয়েছেন ৬৫ দিন বিদেশে। সমালোচকরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতে সংকট যখন চরমে- তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধানের এত ঘন ঘন বিদেশ সফর অগ্রহণযোগ্য ও প্রশ্নবিদ্ধ। তার এই ব্যস্ত ‘ভ্রমণপ্রীতি’ যখন একদিকে গ্রাহক আতঙ্কে ব্যাংক থেকে টাকা তুলছেন, তখন অন্যদিকে সরকারের নীতিনির্ধারণেও তৈরি করছে ধোঁয়াশা ও আস্থাহীনতা।
গত বছরের ১৪ আগস্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে একাধিক অনুষ্ঠানে ড. মনসুর জানিয়েছেন দেশের ব্যাংক খাতের করুণ বাস্তবতা। তিনি বলেন, দেশের ১০টি ব্যাংক দেউলিয়াত্বের পথে এবং কয়েকটির “বাঁচার সম্ভাবনাও ক্ষীণ।” এ ধরনের মন্তব্যে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে, যার ফলে অনেকেই হুমড়ি খেয়ে পড়েন ব্যাংক থেকে টাকা তুলতে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেক ব্যাংক দিনে ৫ হাজার টাকার বেশি দিতে পারেনি। অনলাইন লেনদেন অচল, বুথে টাকা নেই এবং গ্রাহকদের তদবির করেও টাকা না পাওয়ার বাস্তবতা তুলে ধরেছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও গভর্নর ব্যাংকগুলোকে সহায়তার আশ্বাস দেন কিন্তু বাস্তবে অনেক গ্রাহক এখনো অর্থ ফেরত না পাওয়ার অভিযোগ করছেন।
শুরুতে নগদ সংকটে টাকা ছাপানোর বিপক্ষে মত দিলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে সরে এসে গভর্নরের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাপিয়ে আর্থিক খাতে সঞ্চালন করে। তবুও সংকট কাটেনি বরং আরও ঘনীভূত হয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের মে- এই সময়ে ড. মনসুর নয়টি দেশে নয়বার সফর করেন, যার মধ্যে ৬৫ দিন তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। এই সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে, জাপান, কোরিয়া, জিবুতি, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই, লন্ডন এবং ভারত সফর করেন।
তালিকা অনুযায়ী, অনেক সফর ছিল আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ ও প্রতিনিধিত্বমূলক, যেগুলোর জন্য আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা দায়িত্ব পালন করতেন। কিন্তু এবার গভর্নর নিজেই গিয়েছেন। এমনকি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা বা কার্ড উদ্বোধনের মতো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমেও তাকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে, যখন দেশে ব্যাংক খাতে এমন ভয়াবহ আস্থাহীনতা, তখন গভর্নরের ঘনঘন বিদেশ সফরের প্রাসঙ্গিকতা কী? জনগণের করের টাকায় এই ভ্রমণের অর্জন কী- তা এখনো পরিস্কারভাবে জানানো হয়নি। পাচার হওয়া ১ টাকাও এখনো ফেরত আসেনি, কোনো মামলা হয়নি, এমনকি বৈদেশিক রিজার্ভেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। তবে কেনো এত সফর?
বিশ্লেষকদের মতে, “ভ্রমণ নয়, সফরের অর্জনই আসল। জনগণ জানতে চায় এসব সফরে কী হলো, কী চুক্তি হলো বা দেশে কী বিনিয়োগ এল।”
গত ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গতকাল পর্যন্ত মোট ২৮৪ দিন পূর্ণ করেছেন ড. আহসান এইচ মনসুর। এর মধ্যে ৯১ দিন ছিল সরকার নির্ধারিত ছুটি (শুক্র, শনি, ঈদসহ বিভিন্ন দিবস) এবং ৬৫ দিন ছিলেন বিদেশ সফরে। অর্থাৎ মোট ১৫৬ দিন তিনি অফিসে ছিলেন না। ফলে অফিস করেছেন মোটে ১২৮ দিন। এ সময়ের মধ্যে ব্যাংক খাত চরম সংকটে গেলেও তাঁর দাপ্তরিক উপস্থিতি ছিল অপ্রতুল।
সম্প্রতি গভর্নর জানিয়েছেন, দেশের ১০টি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে দুটি শক্তিশালী ইসলামী ব্যাংকে রূপান্তর করা হবে। তবে তার এই একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইসলামি ব্যাংকের গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, “দেশে প্রচলিত ধারার অনেক দুর্বল ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র ইসলামি ব্যাংকগুলোকেই একীভূত করার সিদ্ধান্ত বিভাজনমূলক।”
ব্যাংক খাতের ওপর আস্থা রাখতে বললেও মাঝে মাঝেই নিজেই অস্থিতিশীল বক্তব্য দিচ্ছেন গভর্নর- এমন অভিযোগ উঠেছে। এতে করে আমানতকারীদের মধ্যে দ্বিধা ও আস্থাহীনতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গত ১৫ বছরে (২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকৃত অর্থে নীতি নির্ধারণী স্বাধীনতা হারিয়েছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা আজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
নতুন গভর্নর আসায় কিছুটা আশার আলো দেখেছিলেন শিল্পোদ্যোক্তারা। কিন্তু উচ্চ সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানে স্থবিরতা ও বিদ্যুৎ সংকট সেই আশাকে ম্লান করে দিয়েছে।
গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারবার নীতিসুদহার বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের সুদহার বেড়ে ১৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৮ শতাংশে নেমেছে। এতে নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
যেখানে একটি স্থিতিশীল আর্থিক নীতিনির্ধারক প্রয়োজন ছিল, সেখানে গভর্নরের বিদেশ সফরের হার ও বক্তব্য আর্থিক খাতের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ।
তবে কেউ কেউ বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের আন্তর্জাতিক পরিসরে সক্রিয় অংশগ্রহণ দেশের ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় সহায়ক হতে পারে। তবু সেটি তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যদি সফরের সুবিধা ও অর্জন জনসাধারণের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়।
