দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জুনের তুলনায় জুলাই মাসে দেশে ডেঙ্গুতে সংক্রমণ এবং মৃত্যু দুটোই দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা এবং জনসচেতনতার অভাবের কারণে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশা বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব, অর্থাৎ ব্রুটো ইনডেক্স (BI) ২০-এর নিচে। এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারণে স্বীকৃত এই সূচক অনুযায়ী, যদি কোনো এলাকার BI ২০ শতাংশের বেশি হয় তাহলে সেখানে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব উচ্চমাত্রায় হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এই পরিস্থিতি শুধু ঢাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম, বরগুনা, কুমিল্লা ও কক্সবাজার শহরেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।
সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বমুখী-
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ২০ হাজার ৭০২ জন এবং মারা গেছেন ৮১ জন। জুন মাসে মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জনের, সেখানে চলতি জুলাই মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের। আক্রান্তের সংখ্যাও দ্বিগুণের কাছাকাছি: জুনে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৫ হাজার ৯৫১ জন, আর জুলাই মাসে ১০ হাজার ৪০৬ জন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মোট সংক্রমণের চেয়েও শুধু জুলাই মাসেই আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। জুন-জুলাই মিলিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ২৯৬ জন।
রাজধানীর বাইরে বিস্তার বেশি-
এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা, বাকি ৭৯ শতাংশই ঢাকার বাইরের। এমনকি গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩৮৬ জনের মধ্যে ঢাকার বাইরের রোগীর সংখ্যাই বেশি, এবং একই সময় মারা গেছেন আরও দুইজন।
ঢাকায় সংক্রমণও ধীরে ধীরে বাড়ছে। জুলাই মাসের শুরুর দিকে ঢাকার বাইরে সংক্রমণ বেশি থাকলেও- গত দুই সপ্তাহে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির হার বেড়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার উত্তর সিটিতে রোগীর সংখ্যা কম। গত ২৪ ঘণ্টায় উত্তরের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া ৪২ জন রোগীর মধ্যে মাত্র ১৮ জন এই সিটির বাসিন্দা, বাকিরা বাইরের।”
মৃত্যুর জন্য কে দায়ী?
চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ৮১ জনের মধ্যে ৪৬ জনই ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে মারা গেছেন। বাকি মৃত্যুর ঘটনা দেশের অন্যান্য স্থানে ঘটেছে। অথচ ২০২৪ সালের এই সময়ে মৃতের সংখ্যা ছিল ৫৬ জন।
বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাফিলতি, স্থানীয় সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ঘাটতি এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ বিভাগের লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক হালিমুর রশীদ বলেন, “চিকিৎসা সরঞ্জামের কোনো ঘাটতি নেই। প্রতিটি হাসপাতালকে পরিচালন বাজেট থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে রোগীরা হাসপাতালে আসে অনেক দেরিতে। তখন চিকিৎসকদের কিছু করার থাকে না।”
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, “রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণ সরকারের সাধারণ এবং অব্যবস্থাপিত কার্যক্রম। সাধারণ মানুষের কাছে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ পৌঁছায়নি। নীতিনির্ধারকরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে মনে হয় না।”

