বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলো মাধ্যমিক শিক্ষা, যেখানে দেশের তরুণ প্রজন্মের জ্ঞানের ভিত্তি গড়ে ওঠে। কিন্তু গত দশ বছর ধরে মাধ্যমিক শিক্ষার মানে ক্রমশ অবনমন ঘটছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কেমন অবস্থানে আছে, তা বোঝার জন্য প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মান পরিমাপের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অভাব থাকায় দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত চিত্র স্পষ্টভাবে জানা সম্ভব নয়। তবে বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্সসহ কিছু তথ্য ও জাতীয় প্রতিবেদন থেকে এই শিক্ষার মানের অবনমন চিত্র স্পষ্ট দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা: তথ্যের অভাব ও হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স:
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে ‘টাইমস হায়ার এডুকেশন’ বা ‘কিউএস র্যাংকিং’-এর মতো আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেশের উচ্চশিক্ষার মানের অবস্থান বোঝা যায়। কিন্তু প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষার মান আন্তর্জাতিকভাবে তুলনা করার কোনও স্বতন্ত্র র্যাংকিং সিস্টেম বাংলাদেশে নেই। এর ফলে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক তুলনামূলক তথ্যের অভাব রয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স’-এর ২০২০ সালের প্রতিবেদন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সংকট তুলে ধরেছে। এই ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর ২ মাস শিক্ষাজীবন শেষে অর্থাৎ একাদশ শ্রেণীতে যা শিখছে, তা আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ছয় বছরের (ষষ্ঠ শ্রেণীর) দক্ষতার সমান। অর্থাৎ দশম-একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানে ষষ্ঠ শ্রেণীর দক্ষতাও অর্জন করতে পারেনি। এর আগের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে এই দক্ষতার স্তর ছিল ৬ বছর ৫ মাস বা সপ্তম শ্রেণীর সমান। এ থেকে স্পষ্ট হয়, দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মানে অবনমন ঘটেছে।
ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক একেএম ইলিয়াস বলছেন, ‘অটোপাস এবং সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণের মতো সিদ্ধান্ত শিক্ষার মানকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। দেশে বিগত দেড় দশকে শিক্ষাকে সহজীকরণ এবং প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষার গুরুত্ব কমানোর কারণে শিক্ষার্থীরা সঠিক দক্ষতা অর্জন না করেই পরবর্তী পর্যায়ে উত্তীর্ণ হচ্ছে।’
করোনাকালীন শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষা সংকট: ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারীর প্রভাবে শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় ধরণের ব্যাঘাত ঘটে। সরকার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অটোপাস ঘোষণা করে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এছাড়া চলতি বছর শিক্ষার্থীদের দাবিতে কিছু বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে সেগুলোতেও অটোপাস দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।
২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা পূর্ণ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে পাসের হার ছিল গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন- মাত্র ৬৮.৪৫ শতাংশ। পরীক্ষার ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাসকৃত শিক্ষার্থীর প্রায় ১৭ শতাংশ ৪০ শতাংশের কম নম্বর পেয়েছে, অর্থাৎ তাদের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী কোনো প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
শিক্ষা উপদেষ্টা মন্তব্য করেন, ‘গত কয়েকবছর ছাত্র-ছাত্রীদের নম্বর ফুলিয়ে দেওয়া হতো সরকারের সাফল্য দেখানোর জন্য। তবে এবার প্রকৃত মূল্যায়ন হয়েছে, যা শিক্ষার মানের প্রতি সত্য প্রতিফলন।’
প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার মানের ঘাটতি: মাধ্যমিক শিক্ষার অবনমনের প্রভাব প্রাথমিক স্তরেও স্পষ্ট। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদন’-এর সর্বশেষ ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলায় মাত্র ৫১ শতাংশ এবং গণিতে ৩৯ শতাংশ কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণীতে বাংলায় ৫০ শতাংশ এবং গণিতে ৩০ শতাংশ শিক্ষার্থীই কাঙ্ক্ষিত দক্ষতায় পৌঁছেছে।
২০১১ সালের প্রতিবেদনের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলায় দক্ষতা অর্জনে ১৬ শতাংশ এবং গণিতে ১১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পঞ্চম শ্রেণীতে বাংলায় কিছুটা উন্নতি হলেও গণিতে অবনতি হয়েছে।
এ বছর সেপ্টেম্বর থেকেই আমরা টিমস (TIMSS) স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে যুক্ত হব। তারা আমাদের চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করে জানাবে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান কোথায়। ২০২৭ সাল নাগাদ এর ফলাফল পাওয়া যাবে। আশা করছি এ বিষয়টি শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
-ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, শিক্ষা উপদেষ্টা, অন্তর্বর্তী সরকার।
শিক্ষার মান বৃদ্ধিতে গুণগত পরিবর্তনের অভাব: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘বিগত দেড় দশকে শিক্ষাক্ষেত্রে নেয়া উদ্যোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ছিল, যা শিক্ষার গুণগত উন্নয়নে কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। প্রধানত অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়া হলেও শিক্ষার্থীদের শিখন-শেখানোর গুণগত মান উন্নয়নে কোনো মনোযোগ নেই।’
তিনি আরো বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা কতটা দক্ষ হচ্ছে সে বিষয়ে মনিটরিং নেই এবং করোনাকালে দীর্ঘ বিরতি, অটোপাস, সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণের মতো সিদ্ধান্ত শিক্ষার অবনমনে বড় ভূমিকা রেখেছে।’
মাধ্যমিক স্তরের দক্ষতার সাম্প্রতিক মূল্যায়ন: ২০১৯ সালের ‘ন্যাশনাল স্টুডেন্টস অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট’ অনুযায়ী, মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স নিম্নরূপ ছিল—
- ইংরেজিতে ষষ্ঠ শ্রেণীর মাত্র ৯.৩% শিক্ষার্থী ব্যান্ড ৬ (সর্বোচ্চ) দক্ষতা অর্জন করেছে। দশম শ্রেণীর ক্ষেত্রে এই হার ৪০.৪%।
- গণিতে ষষ্ঠ শ্রেণীর মাত্র ৫.১% শিক্ষার্থী ব্যান্ড ৬ দক্ষতা অর্জন করেছে। দশম শ্রেণীর ক্ষেত্রে এই হার ২৮.৪%।
- বাংলায় শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক ভালো ফল করেছে; ষষ্ঠ শ্রেণীতে ২৫.৮%, দশম শ্রেণীতে ৬৪.৩% শিক্ষার্থী ব্যান্ড ৬ দক্ষতায় ছিল।
এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, গণিতে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা খুবই কম এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজন।
শিক্ষার মান উন্নয়নে অভিজ্ঞদের পরামর্শ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার মানের অবনমনের পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ, ক্লাসরুম ডিজিটালাইজেশন হয়েছে, কিন্তু শিখন-শেখানোর গুণগত উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের নামে দুর্নীতি হয়েছে যা শিক্ষার ক্ষতি করেছে।’
এ সরকারের মাধ্যমে আমরা শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করেছিলাম কিন্তু সরকারের কর্মকাণ্ডে সে রকম কিছু দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষা সংস্কারের জন্য কোনো কমিশন হয়নি, শিক্ষার মূল সংকটগুলো নিরসনে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেয়া হয়নি
-রাশেদা কে চৌধুরী, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের শিক্ষার মূল সংকটগুলোকে চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বৃত্তি পরীক্ষার মতো উদ্যোগ বৈষম্য বাড়াবে। বরং নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার জানান, ‘শিক্ষার মান আন্তর্জাতিকভাবে যাচাই করার জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টিমস (TIMSS) মূল্যায়ন প্রোগ্রামে আমরা যুক্ত হচ্ছি। এর মাধ্যমে চতুর্থ ও অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক মানের সাথে তুলনা করা হবে এবং ২০২৭ সালে ফলাফল পাওয়া যাবে। আশা করছি এটি শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।’
পরিশেষে, বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষার মান গত এক দশক ধরে অবনমিত হয়েছে, যা জাতীয় উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং তার পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় নেয়া অটোপাস ও সিলেবাস সংক্ষিপ্তকরণের মতো সিদ্ধান্ত শিক্ষার মানকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রাথমিক স্তর থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার মানে অবনমন দেখা গেছে, যা পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষার মান ও দক্ষতাতেও প্রভাব ফেলবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী মনিটরিং, দক্ষ শিক্ষক সংকট পূরণ, পরীক্ষার মান নির্ধারণ ও শিক্ষাব্যবস্থায় নীতিগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অবিলম্বে অনুভূত হচ্ছে। নতুন করে আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থান জানা এবং তার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া গেলে দেশের শিক্ষার মানে ধীরে ধীরে উন্নয়ন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হচ্ছে।

