গত বছরের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানের অনেক আগেই বাংলাদেশ পুলিশকে প্রাণঘাতী অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছিল। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অভ্যুত্থানের পূর্বে পুলিশ বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্রের তুলনায় প্রায় সাতগুণ বেশি ছিল। এসব অস্ত্রই ব্যবহার করা হয় বিক্ষোভ দমন করতে, যার ফলে সংক্ষিপ্ত সময়ে প্রচুর প্রাণহানি ঘটে।
বাংলাদেশ পুলিশের অস্ত্র ভাণ্ডারে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ওপর বিপুল পরিমাণ ব্যয় করা হয়। ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২ কোটি ৪৯ লাখ রাউন্ড প্রাণঘাতী গুলির ক্রয় করা হয়, যেখানে টিয়ার গ্যাস এবং রাবার বুলেটের মতো নিরাপদ সরঞ্জামের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০ লাখ ইউনিট। অর্থাৎ প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিমাণ নিরাপদ সরঞ্জামের সাতগুণের বেশি।
আমদানি নথি অনুযায়ী, প্রাণঘাতী অস্ত্র কেনার জন্য এই তিন বছরে ২৪০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে, যা রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাসের জন্য ব্যয় করা ১৯১ কোটি টাকার প্রায় দেড়গুণ বেশি। এই অস্ত্র সংগ্রহের ফলে গত বছরের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত সংঘাত এবং প্রাণহানির পেছনে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ধরা হয়।
অথচ, একটি বেসামরিক বাহিনীর হাতে সামরিক গ্রেডের অস্ত্র তুলে দেওয়া কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিক্ষোভ দমনে যুদ্ধের রাইফেল ব্যবহৃত হয়েছে-
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর আগে, অর্থাৎ ২০২২ সালে বাংলাদেশ পুলিশ ১৮ হাজার ৭.৬২ মিমি সেমি-অটোমেটিক রাইফেল আমদানি করে। পরবর্তীতে এই অস্ত্রগুলো দিয়েই বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানোর ছবি উঠে আসে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে এবং স্থানীয় গণমাধ্যমেও। এই রাইফেলের জন্য প্রায় ১০ লাখ গুলি মজুত ছিল।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্যদের বর্ম ভেদ করার জন্য তৈরি এই গুলি সাধারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য নয়। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাবের মতো আধা-সামরিক বাহিনীর কাছেই এই ধরনের অস্ত্র থাকার কথা। বেসামরিক প্রয়োজনে এগুলো কেনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।’
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শ্রম ও নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, ‘৭.৬২ মিমি রাইফেলের দুটি ফায়ারিং মোড রয়েছে— একক এবং র্যাপিড ফায়ারিং। আমরা ভিডিওতে দেখেছি অধিকাংশ সময় র্যাপিড ফায়ারিং মোড ব্যবহার করা হয়েছে, যা মূলত যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়।’ তিনি বলেন, ‘চীনের তৈরি এগুলো একটি ‘সেরা কিলিং মেশিন’।’
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের ‘আর্মস অ্যান্ড অ্যামুনিশন এনটাইটেলমেন্ট কমিটি’ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রস্তাব দেয়, প্রাণঘাতী ৭.৬২ মিমি রাইফেলের বদলে পিস্তল ব্যবহার করা উচিত হতাহত কমাতে। পুলিশ সদর দপ্তর এখনও এসব অস্ত্র কেনার যৌক্তিকতা ও ভবিষ্যৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রকাশ করেনি।
অস্ত্রের মজুত ও সামরিকীকরণের বিস্তার-
বাংলাদেশ পুলিশের অস্ত্রভাণ্ডার শুধু ৭.৬২ মিমি রাইফেলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২২ সালে তারা দুটি ধরনের মেশিনগান সংগ্রহ করে।
প্রথমটি হলো তুরস্কের তৈরি ৯ মিমি এমএসজি-৯পি সাব-মেশিনগান, যার একটি চালানে মোট ওজন ছিল ৭.৫২ টন। প্রতিটি ম্যাগাজিনে ছিল ৩০ রাউন্ড গুলি। এই অস্ত্রের জন্য প্রায় ৫১ কোটি টাকা ব্যয় হয়। যদিও এর সঠিক গুলি বর্ষণের গতি ও পরিসর স্পষ্ট নয়, তবে অনুরূপ মডেলের এসব মেশিনগান প্রতি মিনিটে কয়েকশ গুলি ছুঁড়তে পারে।
অন্যটি হলো ১২.৭x৯৯ মিমি ন্যাটো ক্রু-সার্ভড মেশিনগান বা ব্রাউনিং মেশিনগান, যা ট্রাইপডে বসিয়ে দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে গুলি করার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে অভ্যুত্থানের সময় এই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একজন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘এই মেশিনগানটি হেলিকপ্টার বা বিমানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নয়। অস্ত্রটি দৈর্ঘ্যে প্রায় পাঁচ ফুট, প্রতিটি গুলির দৈর্ঘ্য ছয় ইঞ্চি। এটি পরিচালনার জন্য দুজনের প্রয়োজন হয়—একজন গুলি চালায়, আরেকজন ম্যাগাজিন ফিড করে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের এ ধরনের অস্ত্রের প্রয়োজন কল্পনাও করা যায় না।’

২০১৪ সালের অক্টোবরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বৈঠকের পর পুলিশকে সামরিকীকরণের কার্যক্রম শুরু হয়। সেই সময়কার এক অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত আইজির মতে, ২০১৩ সালের মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতের বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের কঠিন পরিস্থিতি এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব ফেলেছিল।
এরপর এক যুগের মধ্যে পুলিশকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ১৪,৬০০টি গ্লক পিস্তল এবং ৮,০০০টি ৯ মিমি পিস্তল ক্রয় করা হয়, যার জন্য ১৫ লাখ রাউন্ড গুলি মজুদ ছিল।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন পুলিশের কাছ থেকে প্রাপ্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ দমন করতে ৭.৬২ মিমি রাইফেল, সাব-মেশিনগান ও গ্লক পিস্তল মোতায়েন করা হয়েছিল।
বুলেটের হিসাব ও প্রাণহানির প্রমাণ-
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গবেষক ড. কাজী জাহেদ ইকবাল পুলিশি তথ্য বিশ্লেষণে পান, পুলিশের গুলির ব্যবহার নিয়ে অন্তত ১০০টি মামলার পর্যালোচনায় ৪,৬৩৪ বার তাজা গুলির প্রমাণ পাওয়া গেছে। পুলিশ ৭.৬২ মিমি সেমি-অটোমেটিক রাইফেল, সাব-মেশিনগান, বিডি০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল এবং বিভিন্ন পিস্তল ব্যবহার করেছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশি তথ্য থেকেই দেখেছি, তারা টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেটের থেকে বেশি প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা বিপুল পরিমাণ প্রাণঘাতী অস্ত্রের উপস্থিতি নির্দেশ করে।’
বিক্ষোভ দমনে ব্যবহৃত সিসার ছররা গুলিও (লেড পেলেট) প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়। এই গুলিতে মারা গেছেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র ফারহান ফাইয়াজ। ১৮ জুলাই ধানমন্ডিতে তার শরীর শটগানের পেলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যায়।
২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পুলিশ ১৮ হাজার ১২-বোর শটগান কেনে এবং সিসার গুলির জন্য সাড়ে ১৬ কোটি টাকা ব্যয় করে।
আইনগত বৈধতার প্রশ্ন-
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেন, সেনাবাহিনীর ছাড়পত্র ব্যতীত পুলিশের ‘নিষিদ্ধ বোরের’ অস্ত্র আমদানির কোনো আইনি ভিত্তি নেই। উল্লেখিত অধিকাংশ প্রাণঘাতী অস্ত্র এই ক্যাটাগরির মধ্যে পড়ে।
শুল্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এসএমজি ও মেশিনগানগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পায়। তবে ৭.৬২ মিমি রাইফেলগুলো পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) কর্তৃক খালাস পায়। চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে এসব চালান খালাসের জন্য চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ স্বাক্ষর দেয়। সেনাবাহিনীর অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
বিভিন্ন দেশ থেকে অস্ত্র আমদানি-
বাংলাদেশ পুলিশকে অস্ত্র সরবরাহে শীর্ষে ছিল তুরস্ক। দেশটির আটটি কোম্পানি থেকে প্রায় ১৩৪ কোটি টাকার অস্ত্র ও গোলাবারুদ কেনা হয়, যার মধ্যে ছিল সাব-মেশিনগান, পিস্তল, ১২-বোর শটগান ও সিসার গুলি।
যুক্তরাষ্ট্রের ছয়টি কোম্পানি থেকে কেনা হয় ৫৬ কোটি টাকার অস্ত্র, যার মধ্যে রয়েছে ক্রু-সার্ভড মেশিনগান ও গ্লক পিস্তল। এছাড়াও চীনের ছয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে ৪৪ কোটি টাকার অস্ত্র আমদানি করা হয়। স্পেন ও সাইপ্রাস থেকেও সাড়ে আট কোটি টাকার সিসার গুলি এসেছে।

