ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী। শহরটি যেন এক বেনারসি শাড়ির আঁচল। এক প্রান্তে সোনালি ঝলক, আরেক প্রান্তে গলিত সুতোর মতো দারিদ্র্যের ছাপ। একই শহরে দুটি ভিন্ন পৃথিবী—একটি বিলাসিতার, আরেকটি টিকে থাকার লড়াইয়ের।
অর্ধশতকের স্বাধীনতার পরও ঢাকা শুধু একটি শহর নয় বরং এক অদৃশ্য শ্রেণিবৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। গুলশান-বনানীর ঝলমলে আভিজাত্য আর মিরপুর, কড়াইল ও রায়েরবাজারের বস্তির অন্ধকার—এই বিপরীত চিত্রেই বিভক্ত আমাদের রাজধানী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে- ঢাকায় প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। ২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, এসব পরিবারের অধিকাংশের দৈনিক আয় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। তাদের নেই নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা বা শিক্ষার সুযোগ।
অন্যদিকে, একই শহরের অভিজাত এলাকায় এক রাতের ডিনারে ব্যয় হয় পাঁচ হাজার টাকারও বেশি। বৈষম্যটি শুধু অঙ্কের নয়, এটি এক নির্মম বাস্তবতা।
বৈষম্যের মূল কারণ
রাজধানীর উন্নয়ন পরিকল্পনায় বস্তিবাসীরা সবসময় উপেক্ষিত। তাদের উপার্জনের বড় অংশ খরচ হয় ভাড়া আর খাবারে। অল্প টাকায় থাকার জায়গা পেতেই তারা ঠাঁই নেয় বস্তিতে। কিন্তু বস্তিতে বাস করেও নিরাপত্তা মেলে না। প্রায় প্রতিবছরই অগ্নিকাণ্ডে নিঃস্ব হয় হাজারো পরিবার।
অন্যদিকে, প্রভাবশালীদের অবৈধ দখল প্রচেষ্টা, সীমিত সুযোগ-সুবিধা, নিম্ন শিক্ষার হার ও কর্মসংস্থানের অভাব বস্তিবাসীদের শহরের কেন্দ্রে থেকেও উন্নয়নের বাইরে ফেলে রাখে। এভাবেই বিস্তৃত হয় অর্থনৈতিক বৈষম্য।
সমাধান কোথায়?
ধনী-গরিবের ব্যবধান কমাতে হলে ঢাকার উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। বস্তি উচ্ছেদ নয়, পুনর্বাসনের প্রকল্প গ্রহণ জরুরি। নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর আবাসন নিশ্চিত করলে বস্তিবাসীরাও উন্নয়নের স্রোতে যুক্ত হতে পারবে।
সাথে দরকার দক্ষতা উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। নগর পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা আনা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ করাও সমাধানের বড় শর্ত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানসিকতার পরিবর্তন। দরিদ্র মানুষ সমাজের বোঝা নয়, তারা সম্ভাবনার অংশ। বস্তির প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন সংগ্রাম করে টিকে থাকার জন্য। গুলশান-বনানীর শিশিরভেজা ভোর তখনই অর্থবহ হবে, যখন কড়াইল বস্তির শিশুর চোখেও জ্বলে উঠবে নতুন স্বপ্ন।
ঢাকা শহরকে সবার জন্য বাসযোগ্য করা জরুরি। বৈভব ও বঞ্চনার দ্বৈত চিত্র যদি এভাবেই থেকে যায়, তবে এই বিভক্ত রাজধানী ফিরিয়ে দেবে কেবল বিভাজন আর বঞ্চনা।

