চট্টগ্রামে শহরের তৃতীয় বাস টার্মিনাল আগামী ফেব্রুয়ারিতে চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৯৩ সালে দ্বিতীয় টার্মিনাল নির্মিত হওয়ার পর ৩৩ বছর পর এটি শহরের যানজট কমাতে এবং সড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থা উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
টার্মিনালটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে কুলগাঁও-বালুচরায় নির্মিত হচ্ছে। কাজের প্রায় ৬০ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ জানুয়ারির মধ্যে শেষ হলে ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি খুলে দেওয়া সম্ভব হবে।
৮.১০ একর জমির উপর নির্মিত এই টার্মিনালে একসাথে ২০০টি বাস ও ট্রাক থাকার সুবিধা থাকবে। সম্পূর্ণ নির্মাণের পর সিটি করপোরেশন টার্মিনালটি ভাড়া দিয়ে আয়ও অর্জন করবে।
চট্টগ্রামের প্রথম বাস টার্মিনাল কাদমতলি (১৯৬৬) এবং দ্বিতীয়টি বাহাদ্দারহাটে (১৯৯৩) নির্মিত হয়। দীর্ঘ তিন দশক ধরে নতুন কোনো শহর টার্মিনাল নির্মাণ হয়নি। আজ কাদমতলি ও বাহাদ্দারহাট টার্মিনাল তাদের ক্ষমতার চেয়ে বেশি যানবাহন পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
উত্তর চট্টগ্রামের রুটে টার্মিনাল সুবিধার তীব্র ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় বাস মালিকদের সংগঠন জানায়, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে প্রতিদিন ৫০০-৬০০টি বাস চলাচল করে। নতুন বালুচর টার্মিনাল বাহাদ্দারহাট ও কাদমতলির চাপ কমাবে। রাউজান, হাটহাজারি, ফটিকছড়ি, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি থেকে যাত্রীরা সরাসরি এই টার্মিনাল থেকে বাসে ওঠা-নামা করতে পারবে। এতে শহরের যানজট ও অপেক্ষার সময় অনেক কমবে।
শহর কর্তৃপক্ষ আশা করছে, বড় বাসগুলোকে কেন্দ্রীয় রাস্তায় না নিয়ে আসার ফলে অক্সিজেন, মুরাদপুর, বাহাদ্দারহাট মোড়, কাদমতলি ও জিইসি মোড়সহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ট্রাফিক কমবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পার্কিং সমস্যা কমবে, চুরি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমবে এবং পরিবহন মালিক ও চালকদের স্বস্তি আসবে।
টার্মিনালে তিনতলা ভবন থাকবে, যাত্রী ওঠা-নামার লেন, টিকিট কাউন্টার, বড় হল এবং লাগেজ রুমের ব্যবস্থা থাকবে। তথ্যকেন্দ্র, ট্যাক্সি বুকিং রুম, রেস্টুরেন্ট এবং পুরুষ ও মহিলাদের জন্য আলাদা টয়লেটও থাকবে। এয়ার কন্ডিশন্ড লাউঞ্জ ও ওয়াই-ফাই সুবিধা থাকবে। পরিবহন স্টাফদের অফিস ও আবাসনও এখানে রাখা হবে।
জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (একনেক) ২০১৮ সালে এই প্রকল্প অনুমোদন করে। বাজেটে জমি অধিগ্রহণের জন্য ২৬০ কোটি টাকা, ভূমি উন্নয়নের জন্য ৩.৩৭ কোটি টাকা, অবকাঠামোর জন্য ৭.৫ কোটি টাকা এবং আঙিনা ও ড্রেনেজ সিস্টেমের জন্য ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সিটি করপোরেশনের এক্সিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার (সিভিল) রিফাতুল করিম বলেন, “আঙিনা, ড্রেনেজ এবং বাউন্ডারি দেওয়ালের প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ, ভবনের অর্ধেক কাজ সম্পন্ন। বাকি কাজ জানুয়ারিতে শেষ হলে ফেব্রুয়ারিতে টার্মিনাল খোলা সম্ভব।” তিনি আরও জানান, “গত বছর জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়, কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলনের কারণে পাঁচ-ছয় মাস বন্ধ ছিল। নতুন মেয়রের দায়িত্ব নেওয়ার পর কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে।”
চট্টগ্রাম-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির আয়োজক সম্পাদক মো. শাহজাহান বলেন, “উত্তর রুটে প্রতিদিন ৫০০টিরও বেশি বাস চলাচল করে। স্থায়ী টার্মিনাল না থাকায় অনেক বাস রাস্তায় পার্ক করে, যা ট্রাফিক জ্যাম, জ্বালানি চুরি ও দুর্ঘটনার কারণ হয়। নতুন টার্মিনাল এই সমস্যাগুলো অনেক কমাবে।”
তিনি আরও বলেন, “যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক সেবা দিলে শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
বালুচর টার্মিনাল চালুর পর চট্টগ্রামের পরিবহন খাত দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি পাবে। যাত্রীরা নিরাপদ ও সুবিধাজনক ভ্রমণের আশা রাখতে পারবে। চালক ও পরিবহন মালিকরা পাবেন সুসংগঠিত একটি টার্মিনাল। শহরের পরিকল্পনাকারীরা মনে করছেন, টার্মিনালটি শহরের মোট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করে তুলবে এবং ভবিষ্যতে আরও অবকাঠামোগত প্রকল্পের দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

