বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ, নাটকীয় ও প্রভাবশালী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)
চার দশকের বেশি সময় ধরে যিনি বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন, যাঁকে ঘিরে নব্বইয়ের দশক থেকে দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে, সেই খালেদা জিয়ার বিদায় মানে কেবল একজন রাজনীতিকের মৃত্যু নয়—এটি একটি যুগের অবসান।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে। তাঁর পিতা মেজর (অব.) ইস্কান্দার মজুমদার এবং মাতা তায়েবা মজুমদার। শৈশব থেকেই তিনি শৃঙ্খলা ও আত্মমর্যাদাবোধের পরিবেশে বড় হন, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পড়াশোনা ও ব্যক্তিগত জীবন
খালেদা জিয়া দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করেন। শিক্ষাজীবনে তিনি ছিলেন নীরব, সংযত ও দায়িত্বশীল—রাজনীতির সঙ্গে তখনো সরাসরি কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
বৈবাহিক জীবন
১৯৬০ সালে তিনি তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দাম্পত্য জীবন থেকেই তিনি প্রত্যক্ষ করেন সামরিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠিন দিকগুলো। তাঁদের দুই পুত্র—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো। স্বামী জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠা এবং পরবর্তীতে তাঁর হত্যাকাণ্ড খালেদা জিয়ার জীবনকে আমূল বদলে দেয়।

মুক্তিযুদ্ধে খালেদা জিয়া
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদা জিয়া সরাসরি রণাঙ্গনে না থাকলেও একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নজরদারি, গৃহবন্দিত্ব ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটান। জিয়াউর রহমান তখন মুক্তিযুদ্ধের একজন গুরুত্বপূর্ণ সেক্টর কমান্ডার ও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে ভূমিকা রাখছিলেন। সেই সময়ের মানসিক চাপ ও আত্মত্যাগ খালেদা জিয়াকে ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করে।
গৃহবধূ থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
রাজনীতির সঙ্গে তখন তাঁর কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এমনকি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থাতেও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হননি। দুই ছেলে—তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো—নিয়ে ছিল তাঁর সংসার। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন।

বিপর্যস্ত বিএনপির হাল ধরার সময়
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপি চরম সংকটে পড়ে। দলীয় কোন্দল, বিভক্ত নেতৃত্ব এবং একাংশের সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়া—সব মিলিয়ে বিএনপির অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সেই পরিস্থিতিতে দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধে ১৯৮৩ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন। প্রথমে ভাইস চেয়ারম্যান, পরের বছর ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
বিএনপির সাবেক নেতা ও জিয়াউর রহমানের একান্ত সচিব অলি আহমেদের ভাষায়, “দলকে টিকিয়ে রাখতেই খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসতে অনুরোধ করা হয়েছিল।”
সমালোচকেরা অবশ্য বলেন, তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ তাঁর জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন, পুরুষশাসিত সমাজে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটি বড় দলকে নেতৃত্ব দিয়ে নিজের যোগ্যতায় অবস্থান তৈরি করা সহজ কাজ নয়।

এরশাদবিরোধী আন্দোলন ও ‘আপসহীন নেত্রী’
খালেদা জিয়া রাজনীতিতে সক্রিয় হন এমন এক সময়ে, যখন দেশে চলছিল জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় সাতদলীয় ঐক্যজোট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে তখন আটদলীয় জোট এবং বামপন্থীদের পাঁচদলীয় জোটও রাজপথে সক্রিয় ছিল।
১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি ও তাদের জোট সেই নির্বাচন বর্জন করে টানা নয় বছর আন্দোলনে থাকে। এই দীর্ঘ আন্দোলনের সময় খালেদা জিয়া তিনবার গ্রেপ্তার হন। এই অনড় অবস্থানের কারণেই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই খালেদা জিয়া বিএনপিকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং নিজেকে একজন পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয় এবং ২০ মার্চ খালেদা জিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুসলিম বিশ্বে তিনি ছিলেন পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টোর পর দ্বিতীয় নারী সরকারপ্রধান।
এই নির্বাচনে তিনি পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই জয়ী হন—একটি বিরল রেকর্ড। তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার পঞ্চম সংসদে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বাতিল করে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনে। দীর্ঘ ১৬ বছর পর বাংলাদেশ আবার সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে আসে, যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।

ক্ষমতা, বিরোধিতা ও ফের ক্ষমতায় ফেরা
প্রথম মেয়াদের শেষ দিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। তবে এই সংসদ টিকে ছিল মাত্র ১২ দিন। ষষ্ঠ সংসদে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
এরপর ১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে তিনি বিরোধীদলীয় নেত্রী হন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ পাঁচ বছর দেশ পরিচালনা করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর আবার বিরোধীদলীয় নেত্রী হন।
জোট রাজনীতি ও বিতর্ক
১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিএনপি জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল নিয়ে চারদলীয় জোট গঠন করে, যা পরে ২০দলীয় জোটে রূপ নেয়। এই জোটে ইসলামপন্থী দলের উপস্থিতি নিয়ে বহু সমালোচনা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, জোট রাজনীতির দায় এককভাবে খালেদা জিয়ার ওপর চাপানো যায় না।
কারাবাস, অসুস্থতা ও নির্বাহী মুক্তি
২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১৭ বছরের সাজা হয় তাঁর। দীর্ঘ কারাভোগের পর অসুস্থতার কারণে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান।
তিনি লিভার সিরোসিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদরোগসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে তাঁর হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয় এবং লিভারের জটিল চিকিৎসা দেওয়া হয়। গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর তিনি পূর্ণ মুক্তি পান এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন যান।
নির্বাচনে অপরাজেয় অবস্থান
বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো—খালেদা জিয়া যে কয়টি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সেগুলোতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কখনোই পরাজিত হননি। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটব্যাংকের শক্তি এই বাস্তবতাকেই তুলে ধরে।
তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া
খালেদা জিয়া তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত। তাঁর প্রথম মেয়াদে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় মেয়াদে অর্থনীতি, শিক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও বিতর্ক ও রাজনৈতিক সংঘাত তাঁর শাসনামলকে ঘিরে ছিল, তবুও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

শেষ অধ্যায়: সম্মান ও ঐক্যের প্রতীক
মুক্তির পর সীমিত পরিসরে তিনি রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সর্বশেষ ২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে অসুস্থ হয়ে পড়েন। অবশেষে ৩০ ডিসেম্বর তাঁর জীবনাবসান ঘটে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের শেষ প্রান্তে এসে খালেদা জিয়া দল-মত নির্বিশেষে ‘ঐক্যের প্রতীক’ হয়ে উঠেছিলেন। বিএনপির ভেতরে তিনি ছিলেন রাজনৈতিক অভিভাবক। পাঁচটি নির্বাচনে ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কখনো পরাজিত না হওয়া এই নেত্রী ইতিহাসে রেখে গেলেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
খালেদা জিয়ার জীবন কেবল ক্ষমতার গল্প নয়; এটি সংগ্রাম, সংকট, সহনশীলতা ও রাজনৈতিক দৃঢ়তার এক দীর্ঘ মানবিক আখ্যান—যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

