আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে নীরবে কিন্তু গভীর প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে উঠেছে পোস্টাল ভোট। নির্বাচন কমিশনের হিসাব বলছে, এবারের নির্বাচনে প্রায় ১৫ লাখ পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ৭ লাখের বেশি ভোট প্রবাসী বাংলাদেশিদের। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক ভোট নির্বাচনের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি খামের ভেতরের একটি ব্যালট পেপারই বদলে দিতে পারে একটি আসনের ভাগ্য। এমনকি প্রভাব ফেলতে পারে পুরো নির্বাচনের চিত্রে। বিশেষ করে যেসব আসনে লড়াই হাড্ডাহাড্ডি, সেখানে পোস্টাল ভোট হয়ে উঠতে পারে প্রকৃত অর্থেই একটি গেম চেঞ্জার। এ কারণে এই ভোটপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা যেমন বাড়ছে, তেমনি উদ্বেগও তৈরি হচ্ছে।
বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য দেশের বাইরে বসে ভোট দেওয়ার সুযোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে বাস্তবে পোস্টাল ব্যালট সংগ্রহ, পাঠানো ও গ্রহণের প্রতিটি ধাপেই রয়েছে নানা জটিলতা। সময়মতো ব্যালট না পৌঁছানো, ঠিকানা সংক্রান্ত বিভ্রান্তি কিংবা মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনিয়মের আশঙ্কার কথা ইতোমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বিপুল সংখ্যক এই ব্যালট যেন কোনোভাবেই ‘অদৃশ্য হাতের’ কবলে না পড়ে। পোস্টাল ভোটের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের প্রতি দাবি উঠেছে, পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহিতাও জরুরি।
পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতায়। সম্প্রতি সেখানে ব্যালট পেতে ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন প্রযুক্তি পেশাজীবী ও ইয়ুথ হাব মালয়েশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা পাভেল সারওয়ার।
তিনি জানান, প্রবাসে থেকেও দেশের জন্য ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত ছিলেন। কিন্তু সেই আনন্দ দ্রুত হতাশায় পরিণত হয় মালয়েশিয়ার পোস্টাল সার্ভিস Pos Laju-এর ট্র্যাকিং জটিলতায়। অ্যাপে তার ব্যালট ‘ডেলিভার্ড’ দেখালেও বাস্তবে তিনি তা পাননি। কোনো ফোন কল বা নোটিশও দেওয়া হয়নি।
পরে কুয়ালালামপুরে Pos Laju-এর প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয়, ফোনে পাওয়া না যাওয়ায় পার্সেলটি ‘রিটার্ন’ করা হয়েছে। তবে পাভেল সারওয়ারের দাবি, তাকে কোনো কলই করা হয়নি। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন, একই অভিযোগ নিয়ে আরও চার-পাঁচজন বাংলাদেশি প্রবাসী উপস্থিত ছিলেন।
নিজের অভিজ্ঞতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরে পাভেল সারওয়ার বলেন, একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে ভোট দেওয়া তার অধিকার। কিন্তু পোস্টাল সার্ভিসের এমন গাফিলতি তাকে হতাশ করেছে। তিনি বলেন, নিজে অফিসে গিয়ে ব্যালট সংগ্রহ না করলে তার ভোট দেওয়ার সুযোগই থাকত না।
পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, ট্র্যাকিং নম্বর জানা থাকলে যে কেউ খুব সহজে অন্যের ব্যালট সংগ্রহ করতে পারে। Pos Laju অফিসে কোনো পরিচয় যাচাই ছাড়াই শুধু নাম ও পাসপোর্ট নম্বর লিখে সাইন করলেই পার্সেল দেওয়া হচ্ছে। এতে কার ব্যালট কে নিচ্ছে, তা কীভাবে যাচাই করা হচ্ছে—সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশি এক্সপ্যাটস ইন মালয়েশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ মুশফিকুর রহমান রিয়াজ। তিনি জানান, এখনো তার ব্যালট হাতে পৌঁছায়নি। পোস্ট অফিসে যোগাযোগ করলে তাকে বলা হয়, তাকে না পেয়ে ব্যালট বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
রিয়াজ বলেন, যেখানে তার ফোন নম্বর দেওয়া ছিল, সেখানে ডেলিভারির সময় একটি কল করলেই সমস্যা সমাধান হতো। কিন্তু তা না করে ব্যালট ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতার আলোকে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসীদের উদ্দেশে পাভেল সারওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, শুধু অ্যাপের ট্র্যাকিংয়ের ওপর নির্ভর না করতে। Pos Laju-এর ওয়েবসাইটে নিয়মিত ট্র্যাকিং নম্বর যাচাই করার আহ্বান জানান তিনি। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে কলের অপেক্ষা না করে দ্রুত নিকটস্থ পোস্ট অফিসে যোগাযোগ করার কথাও বলেন, যাতে ব্যালট ফেরত যাওয়ার আগেই সংগ্রহ করা যায়।
সচেতন মহলের মতে, পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়াকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করতে প্রবাসীদের ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর আরও সক্রিয় ভূমিকা জরুরি। নিয়মিত তথ্য দেওয়া, স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা না বাড়ালে এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটপ্রক্রিয়া ভবিষ্যতে বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১৫ লাখ পোস্টাল ভোট কেবল একটি সংখ্যা নয়। এটি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের এক নীরব শক্তি। এই শক্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি নতুন প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা তৈরি করবে—তা নির্ভর করছে পুরো প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর।

