২০১৯ সালেই বাংলাদেশকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ কৌশলের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। প্রস্তাবটি ছিল বিস্ময়কর ও বিপজ্জনক—মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য দখলের পথে বাংলাদেশকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া। প্রকাশ্যে বলা না হলেও, এই প্রস্তাবের পেছনে ছিল বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব।
১৩ জুন ২০১৯। মার্কিন কংগ্রেসের এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকমিটির চেয়ারম্যান ব্রাড শেরম্যান এক শুনানিতে বলেন, সুদান ভেঙে যদি দক্ষিণ সুদান গঠন করা সম্ভব হয়, তাহলে রাখাইনকে মিয়ানমার থেকে আলাদা করে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা অসম্ভব কেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে বিষয়টি বিবেচনায় নিতে আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্য ছিল কেবল একটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে মিয়ানমারের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ উন্মুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে ওই অঞ্চলে পশ্চিমা শক্তির সামরিক উপস্থিতি জোরদারের সুযোগ তৈরি হতো।
এই প্রস্তাব একক কোনো ঘটনা ছিল না। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ একাধিকবার বাংলাদেশকে মিয়ানমার সীমান্তে যৌথ সামরিক মহড়া এবং রাখাইনে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব দেয়। যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হলে সমরাস্ত্র সরবরাহের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশ সেই পথে এগোয়নি। যুদ্ধের ফাঁদে পা না দেওয়ার পর কৌশল বদলায় পশ্চিমা পক্ষ। ২০২১ সালে বাংলাদেশকে কোয়াড জোটে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ২০২২ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কমানোর বিষয়টি প্রকাশ্য বার্তার মাধ্যমে তুলে ধরা হয়।
এ সময় র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে আকসা (ACSA) ও জিসোমিয়া (GSOMIA)-এর মতো সংবেদনশীল সামরিক চুক্তিতে সই করানোর জন্য কূটনৈতিক চাপ বাড়তে থাকে।
রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রেও পশ্চিমা অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, তারা কখনোই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান চায়নি। আন্তর্জাতিক আদালতে শক্ত মামলা বা কার্যকর কূটনৈতিক চাপের বদলে তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে প্রতীকী ও ফলহীন সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানবিক ভাষার আড়ালে বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থই এখানে মুখ্য ছিল। বাংলাদেশের জন্য এসব প্রস্তাব ছিল সহায়তার চেয়ে ঝুঁকির সম্ভাবনাই বেশি।

