স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পুলিশ কমিশন গঠনের দীর্ঘদিনের দাবি এবং জুলাই সনদের মৌলিক আকাঙ্ক্ষা পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর মাধ্যমে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটি বলছে, পুলিশ সংস্কারের নামে প্রণীত এই অধ্যাদেশে এমন একটি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যা বাস্তবে অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের কর্তৃত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। এর মাধ্যমে পুলিশের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হবে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, অধ্যাদেশে পুলিশ কমিশনকে কেবল একটি ‘সংবিধিবদ্ধ সংস্থা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও ‘স্বাধীন’ বা ‘নিরপেক্ষ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। এটি কোনো অনিচ্ছাকৃত ভুল নয়। বরং সচেতনভাবেই স্বাধীন পুলিশ কমিশনের ধারণা থেকে সরে আসার স্পষ্ট ইঙ্গিত। একই সঙ্গে কমিশনের গঠন, ক্ষমতা ও কার্যপ্রণালি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, যা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে পুলিশ সংস্কার বিষয়ে গৃহীত একমাত্র ঐকমত্যের সুপারিশের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই অধ্যাদেশের অধীনে যদি পুলিশ কমিশন গঠিত হয়, তবে তা স্বাধীন নজরদারি সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে না। বরং এটি অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক আমলাদের নিয়ন্ত্রিত একটি সরকারি কমিশনে পরিণত হবে। এতে পুলিশের ওপর বেসামরিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করা যাবে না। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশ বাহিনী গঠন এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার মৌলিক লক্ষ্য শুরুতেই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
তিনি আরও বলেন, অধ্যাদেশে কমিশনের সদস্য হিসেবে একজন অবসরপ্রাপ্ত গ্রেড-১ সরকারি কর্মকর্তা এবং একজন সাবেক গ্রেড-১ পুলিশ কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাকে ‘সদস্য সচিব’ হিসেবে ক্ষমতাধর অবস্থান দেওয়া হয়েছে। টিআইবি মনে করে, বাংলাদেশে তো নয়ই, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাতেও এটি একটি অস্বাভাবিক ও ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত। এতে কমিশনের চেয়ারম্যান ও অন্যান্য কমিশনারদের কার্যকর ক্ষমতা ও মর্যাদা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা তার অবসর গ্রহণের আগের পদমর্যাদার সমপর্যায়ের করে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনারদের পদমর্যাদা নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারকে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে কমিশনের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত হবে। এতে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হবে এবং কমিশনের নিরপেক্ষতা কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়বে।
পুলিশ কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে গঠিত বাছাই কমিটির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই কমিটির গঠন ও কার্যপদ্ধতি পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। এতে কমিশন গঠনের শুরু থেকেই ক্ষমতাসীন সরকারের পূর্ণ কর্তৃত্ব নিশ্চিত হচ্ছে। স্বাধীনভাবে কমিশন পরিচালনার কোনো বাস্তব সুযোগ থাকছে না।
অধ্যাদেশে সরকারকে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তি বা সরকারি কর্মচারীকে কমিশনে প্রেষণে নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানায় টিআইবি। প্রথম তিন বছরে এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো সংখ্যাগত সীমা না থাকায় সরকার ইচ্ছামতো সংখ্যক কর্মকর্তাকে কমিশনে যুক্ত করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে ৩০ শতাংশ সীমা নির্ধারণ করা হলেও টিআইবি মনে করে, এই হারও সরকারি নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষায়, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ কোনোভাবেই সংস্কারমুখী নয়। বরং এটি পুরোনো নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার পুনর্বাসন। জুলাই সনদের আলোকে যে স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, এই অধ্যাদেশ তা চূড়ান্তভাবে নস্যাৎ করেছে—এটাই টিআইবির অবস্থান।

