গত বছর আমন ধানের ফলন ভালো হলেও চালের দাম কমেনি। বোরো ধানের মৌসুমেও চিকন (মিনিকেট) চালের দাম কমেনি। এবারও খেতের সব আমন ধান তোলা হলেও বাজারে এক টাকাও কমেনি চালের দাম। বরং বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা বা কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। এভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের পকেট খালি হচ্ছে। তার পরও কেউ দায় স্বীকার করছেন না।
গত জুনে বোরো ধান ওঠার পর প্রথমে চিকন চালের দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু ঈদুল আজহায় হঠাৎ বেড়ে যায়। আর কমেনি। বাধ্য হয়ে সরকার চাল আমদানির ঘোষণা দেয়। তার পরও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। খুচরা পর্যায়ে মনজুর, রশিদ, সাগরসহ অন্য কোম্পানির মিনিকেট চাল কেজিপ্রতি ৭৫ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হয়। ডায়মন্ড, হরিণ, মোজাম্মেল কোম্পানির চালের দাম আরো বেশি, ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়। আটাশ চালের দামও বেড়ে ৬২ থেকে ৬৫ টাকায় এবং মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হয়।
দামের সেই ঊর্ধ্বমুখী ধারায় এখনো চলছে চালের বাজার। কয়েক দিনের ব্যবধানে কেজিতে ৪ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে বলে খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতারা জানান। খুচরা বিক্রেতারা জানান, মিল থেকে দাম বাড়ানো হচ্ছে। গতকালও রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজারে মিনিকেট চাল ৭৮ থেকে ৮৬ টাকা, নাজিরশাইল ৭৮ থেকে ৮০, আটাশ চাল ৫৮ থেকে ৬০, আমন ৬০, চিনিগুড়া ১২০, বাসমতী ৯০ থেকে ৯৪ টাকায় বিক্রি হয়।
এ ব্যাপারে মোহাম্মদপুরের টাউন হল বাজারের মাদারীপুর রাইস এজেন্সির রহমান আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের জিজ্ঞাসা করছেন কেন? চালের দাম বেড়েছে কেন এর কারণ জানতে হলে মিলমালিকদের কাছে যান। কারণ তারাই দাম নির্ধারণ করেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন। এ জন্য ধানের মৌসুমেও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। কমছে না দাম। খেতের ধান তোলা হলেও নতুন চাল তারা বাজারে ছাড়ছেন না। আগের চালই বেশি দামে বিক্রি করছেন। আমরা কেজিতে ১ থেকে ২ টাকা লাভ করি।’ অহিদুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী মো. অহিদুর রহমানও একই ধরনের কথা বলেন।
বাদামতলী, নিউ মার্কেট, কারওয়ান বাজারের খুচরা বিক্রেতারাও একই অভিযোগ করে জানান, মিল থেকে বাড়ছে দাম। আতপ চালের ধান তোলাও শেষ। তার পরও কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। এ জন্য আমাদেরও বেশি দামে বস্তার আতপ চাল ১৪০ টাকা কেজি ও বিভিন্ন কোম্পানির প্যাকেটজাত আতপ চালের কেজি ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। সব দোষ আমাদের দেওয়া হয়। কিন্তু ফায়দা লুটছেন মিলমালিকরা। তারাই দাম বাড়াচ্ছেন। অথচ মিলে কোনো অভিযান চালানো হয় না। অভিযান না থাকায় মিলমালিকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
খুচরা বিক্রেতারা আরো জানান, গত বছরও আমন ধান ওঠার পর কমেনি চালের দাম। ভরা মৌসুমেও মোটা চাল (গুটি স্বর্ণা) ৫০ থেকে ৫২ টাকা ও আটাশ চাল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা এবং বিভিন্ন কোম্পানির মিনিকেট চাল ৭০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি হয়। মৌসুমের সময়ও আতপ চাল বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের।
সারা দেশের বিভিন্ন রাইস মিলের চাল ভোক্তাদের কাছে বিক্রির জন্য পাইকারি বাজার কৃষি মার্কেট ও বাদামতলীতে আসে। কৃষি মার্কেট বাজারের জননী এগ্রোর ম্যানেজার আ. রশিদ বলেন, ‘চাল আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এ জন্য চালের দাম বেড়েছে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। কারণ ভারত থেকে পাইজাম, মিনিকেট ও স্বর্ণা চাল আসত দেশে। সরবরাহ বাড়ায় আগে দামও কম ছিল। যেই আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে, দেশে চালের দাম বেড়ে গেছে। এমনকি আতপ (চিনিগুঁড়া) চালের দামও কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।
এ ব্যাপারে মোজাম্মেল অটো রাইস মিলসের চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ বলেন, ‘তিন কারণে চালের দাম বেড়েছে। প্রথমত আমন ধান উঠলেও কৃষকের কাছে তা নেই। তারা বিক্রি করে দিয়েছেন। একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী বা মজুতকারীরা সেই ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন। ভারতের যে চাল দেশে আমদানি হয়, সেটা আগের মতো আসছে না। ধানের দাম বেড়ে গেছে। মিলমালিকরা বেশি করে ধান কিনতে পারছেন না। কাজেই তারা দামও বাড়ান না। যারা প্রকৃত মিলমালিক, তারা বেশি করে ধান ও চাল মজুত করেন না। করা ঠিক না।’
অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘এবারে আতপ চালের ধানের দাম বেশি। ২ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা মণ কেনা হচ্ছে। ধানের দাম বাড়লে চালের দাম তো বাড়বে–এটা স্বাভাবিক ব্যাপার।’
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধানের ভালো ফলন ও মৌসুম থাকা সত্ত্বেও দেশে চালের দাম কমেনি বরং কেজিতে ৪–৫ টাকা করে বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা এর জন্য মিলমালিকদের দাম বাড়ানো ও আমদানি কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন, আর মিলমালিকরা ধানের উচ্চ দাম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের মজুতকরণকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন। সূত্র: খবরের কাগজ

