কমপক্ষে ৪৫ ঋণখেলাপি এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ও অন্যান্য আইনে ঋণখেলাপিদের প্রার্থিতা সীমিত করার সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। তবে ৪৫ প্রার্থী এসব প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে মনোনয়ন পেয়েছেন। অন্যদিকে, ৬৮ জন প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ায় বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন।
রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাই এবং নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আপিল শুনানি শেষ হয়েছে। এখন উচ্চ আদালতে আইনি লড়াই চলছে। বাদ পড়া প্রার্থীদের অনেকেই উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরো (সিআইবি) অনুযায়ী ঋণখেলাপি হলেও মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে ৩১ জন স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রার্থী হন। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে এই ৩১ জনের মধ্যে কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে বাদ পড়েছেন। হাইকোর্টের আদেশে আপিলে আটকে যাওয়ায় তিনি পুনরায় খেলাপির তালিকায় পড়েন।
ইসির আপিল শুনানিতে ঋণখেলাপি প্রার্থীদের নিয়ে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ‘যাদের ঋণখেলাপি সত্ত্বেও ছাড় দিয়েছি, তা দিতে গিয়ে মনে কষ্ট হয়েছে। আইনই তাদের পারমিট করেছে।’
চট্টগ্রাম-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বৈধতা আপিলে মঞ্জুর হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুইটি ব্যাংক তাঁর মনোনয়ন বাতিল চেয়েছিল। শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ প্রার্থীকে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বৈধ করেছি। ব্যাংকের টাকাটা দিয়ে দেন।’
শুধু বিএনপি নয়, ‘কার্যক্রম নিষিদ্ধ’ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে প্রথমবার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও রয়েছেন। ৮২ জন প্রার্থী রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বাতিল হন। ইসির আপিলে তাদের মধ্যে ১৫ জন প্রার্থী টিকে যান। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর দুজন এবং চরমোনাইর ইসলামী আন্দোলনের দুইজন রয়েছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী ঋণখেলাপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। কেউ অন্যের ঋণের গ্যারান্টর হলেও খেলাপি হিসেবে বিবেচিত হবেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরও ঋণ খেলার সত্যতা নিশ্চিত হলে পদ হারানোর বিধান রয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তা, গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এবং অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বারবার বলেছিলেন, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নেওয়া উচিত নয়। তবে শেষ পর্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করেছে। মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এ ক্ষেত্রে রাজপথে আন্দোলন হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, ‘কোনও ত্রুটি বা দুর্নীতির আশ্রয়ে ঋণখেলাপিদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না তা নিশ্চিত নয়। তবে এটি ভালো লক্ষণ নয়। এভাবে নির্বাচনে সুযোগ দিলে ঋণখেলাপির সমস্যা সমাধান হবে না।’
পূর্বের নির্বাচনে আদালতের স্থগিতাদেশ ও তথ্য গোপন করে অনেক ঋণখেলাপি অংশ নিতে পেতেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ব্যাংকগুলোর কাছে ঋণের তথ্য হালনাগাদ করার ক্ষমতা থাকার কারণে সুযোগ সৃষ্টি হয়। এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিশ্চিত করেছে, কোনো ঋণখেলাপি আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অংশ নিতে পারবে না।
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঋণখেলাপির তথ্য সরবরাহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। আদালত বা নির্বাচন কমিশন বৈধ ঘোষণা দিলে ব্যাংকের কিছু করার নেই।
এবার ৩১ ঋণখেলাপি উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে মনোনয়নপত্র বৈধ পেয়েছেন। ১৫ জন বিএনপির। কুমিল্লা-৪ আসনের মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর প্রার্থীতা বাতিল হয়েছে। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশে তিনি নিজের ঋণ খেলাপি না দেখানোর সুযোগ পান। তবে নির্বাচনী হলফনামায় ঋণ নেই উল্লেখ করেছিলেন। এই আসনের অন্যান্য আপিলের প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর দুই প্রার্থী– যশোর-২ মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ এবং কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল হক ঢাকা-২– প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের দুই প্রার্থী, জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি ও এনপিপির প্রার্থীরাও প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। স্বতন্ত্র সাতজনও বৈধ হয়েছেন।
বাকি ৬৭ জন প্রার্থী এখনও বাতিল। কুমিল্লা-১০, যশোর-৪, চট্টগ্রাম-১১, চট্টগ্রাম-১৪ আসনের বিএনপি প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে ঋণখেলাপির কারণে। তবে কিছু প্রার্থী নির্ধারিত তারিখের পর ঋণ পরিশোধ করে বৈধতা ফিরে পেয়েছেন।

