ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হচ্ছে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি)। প্রতীক বরাদ্দ শেষ হওয়ার পর থেকেই প্রার্থীরা মাঠে নামবেন গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ ও পথসভায়। তবে এই আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুকে ঘিরেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আশঙ্কা, নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ, সহিংস আচরণ এবং পেশিশক্তি প্রদর্শনের ঘটনা বাড়তে পারে। বিশেষ করে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরেও। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, নির্বাচনি প্রচারণার শুরু ও শেষ সময়ে সহিংসতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
তবে এসব আশঙ্কার মধ্যেও পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তারা আগেভাগেই প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, দায়িত্বে নিয়োজিত সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং পুরো নির্বাচনকালীন সময়জুড়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাহিনীগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ঠেকাতে জোরালো অভিযান চলছে। পাশাপাশি কারাগার থেকে সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া বিভিন্ন দাগি অপরাধীকেও নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রেখে তাদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে। ভোটের পরিবেশের জন্য হুমকি হতে পারে—এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিষয়ে সব জেলার পুলিশ সুপার এবং মহানগর পুলিশ কমিশনারদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সূত্রগুলো বলছে, আগের প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে প্রচারণা শুরুর আগে ও পরে সংঘর্ষ এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই এবারের নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগেভাগে পরিকল্পনা সাজিয়েছে। লক্ষ্য একটাই—নির্বাচন যেন সহিংসতা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়।
জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য মাঠে থাকবেন। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মোতায়েন থাকবে ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ জন। পাশাপাশি সীমান্ত রক্ষায় বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩ সদস্য, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় এক লাখ সদস্য, র্যাবের প্রায় ৮ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫০০ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার সদস্য নির্বাচনি দায়িত্ব পালন করবেন। নজরদারিতে ব্যবহার করা হবে ড্রোন, যার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতার আশঙ্কা বাস্তব ভিত্তি পেয়েছে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায়। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর মিরপুরের পীরেরবাগ এলাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, যাতে অন্তত ১৬ জন আহত হন। পুলিশের মিরপুর জোনের উপকমিশনার মইনুল হক সংঘর্ষের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এর আগে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাবের উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন নিহত হন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য এবং মনা নামে এক সোর্স গুরুতর আহত হন। একই দিনে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই একে অপরের ওপর হামলার অভিযোগ করেছে। এতে জামায়াতের পাঁচ জন এবং বিএনপির অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়।
এরও আগে রবিবার (১৮ জানুয়ারি) রাতে চৌদ্দগ্রামের কয়েকটি এলাকায় বিএনপি কর্মীর বাড়িতে হামলা, দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর এবং জামায়াতের নির্বাচনি কার্যালয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। গত ১৫ জানুয়ারি লক্ষ্মীপুর সদরেও নির্বাচনি প্রচারণাকে কেন্দ্র করে দুই দলের সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হন।
নির্বাচনি পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার দিন থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জনমনে আস্থা ফেরাতে মাঠে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাশকতা ঘটাতে পারে—এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে। দেশব্যাপী ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে থানা থেকে লুণ্ঠিত অস্ত্রও রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ পুলিশ মোতায়েন থাকবে, সঙ্গে থাকবে ডগ স্কোয়াড। সদর দপ্তর থেকে পুরো নির্বাচন কার্যক্রম মনিটরিং করা হবে এবং পুলিশ সদস্যদের দাফতরিক কাজ কমিয়ে মাঠে বেশি সময় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে আজ প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে শেষ হচ্ছে প্রস্তুতির একটি ধাপ, আর বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে নির্বাচনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর অধ্যায়—মাঠের প্রচারণা।

