দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত সাবেক পুলিশপ্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ এবং সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের মেয়েদের গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান ‘স্মার্ট টেকনোলজিস’ থেকে বডিওর্ন ক্যামেরা কিনেছে পুলিশ। এসব ক্যামেরা ব্যবহার করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন পুলিশ সদস্যরা। তবে ক্যামেরাগুলো ঠিকভাবে কাজ না করলে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত বেনজীর আহমেদের এক মেয়ের এবং সাবেক অর্থমন্ত্রীর মেয়ে নাফিসা কামালের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান স্মার্ট টেকনোলজিস থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই কেনাকাটা হওয়ায় পুলিশের ভেতরেও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে পুলিশের প্রায় সব টেন্ডারই পেয়েছিল স্মার্ট টেকনোলজিস। এবারের বডিওর্ন ক্যামেরা আমদানিতেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ক্যামেরাগুলো ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছালেও এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি হয়নি পুলিশের টেলিকম বিভাগ।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় অঙ্কের দুর্নীতি এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার লক্ষ্যেই প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠরা এমন তৎপরতায় যুক্ত থাকতে পারে।
জানা গেছে, গত বছরের ৯ আগস্ট সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু করতে ২৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪০ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সব কেনাকাটা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর মাধ্যমে করার প্রজ্ঞাপন জারি হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এরই মধ্যে সোর্স মানির অর্থ ব্যবহার করে গোপনে স্মার্ট টেকনোলজিস থেকে চীনা ক্যামেরা কিনেছে পুলিশ বিভাগ।
স্মার্ট টেকনোলজিস ছাড়াও দাহুয়া, টিডিটেক, কেডাকম ও অকজন—এই চারটি প্রতিষ্ঠান বডিওর্ন ক্যামেরা সরবরাহে যুক্ত ছিল বলে জানা গেছে। যদিও দাহুয়া ক্যামেরা বিক্রির তথ্য অস্বীকার করেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কেনাকাটার পুরো প্রক্রিয়া জানতে পুলিশ হেডকোয়ার্টারে যোগাযোগ করা হলেও বিস্তারিত তথ্য মেলেনি।
বিশ্লেষকদের দাবি, লাগামহীন দুর্নীতি চালাতেই গোপনীয়ভাবে এই পণ্য আমদানি করা হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচন ভণ্ডুল করতেও প্রশাসনের একটি অংশ এমন পদক্ষেপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, নির্বাচনের সময় বডিওর্ন ক্যামেরা ঠিকভাবে কাজ না করলে পুলিশ বড় সমস্যায় পড়বে। এতে নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, বডিওর্ন ক্যামেরাগুলো ইতোমধ্যে পুলিশের কাছে পৌঁছেছে। এর বেশি তথ্য তিনি দিতে পারেননি।
সূত্র জানায়, দফায় দফায় বৈঠক করে ৪০ হাজার বডিওর্ন ক্যামেরা কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত আগস্টে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকেও জানানো হয়েছিল, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের জন্য এসব ক্যামেরা কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে শুরু থেকেই ক্যামেরার সংখ্যা এবং ব্যয় নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। কত দামে এসব ক্যামেরা কেনা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করতে রাজি হয়নি পুলিশ সদর দপ্তর।
জানা গেছে, ভোট চুরি ও কেন্দ্র দখল ঠেকাতে বডিওর্ন ক্যামেরাগুলোতে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। কেউ ছুরি, দা বা হকিস্টিকসহ ভোটকেন্দ্রে ঢোকার চেষ্টা করলে ক্যামেরা থেকে তাৎক্ষণিক সতর্ক সংকেত দেওয়ার সক্ষমতা থাকার দাবি করা হচ্ছে।
বডিওর্ন ক্যামেরা একটি বহনযোগ্য ভিডিও যন্ত্র। পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এটি পোশাক বা ইউনিফর্মে সংযুক্ত করে ব্যবহার করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এই ক্যামেরা ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

