জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আজ সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে পাল্টা বা রেসিপ্রোকাল শুল্কসংক্রান্ত এই চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার বলছে, চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশেষ সুবিধা পেতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করা পোশাক সে দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমানে আরোপিত অতিরিক্ত ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক কমতে পারে।
তবে সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এই বিতর্কের মধ্যেই সরকার জানাচ্ছে, বিষয়টি নতুন কোনো উদ্যোগ নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে চলমান আলোচনার ধারাবাহিক অংশ হিসেবেই চুক্তিটি চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আজ সোমবার ৯ ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় চুক্তি স্বাক্ষরের কথা। বাংলাদেশ সময় তখন রাত ১১টা। চুক্তি সইয়ের অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ও বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান সরাসরি উপস্থিত থাকছেন না। ঢাকায় বসেই তাঁরা অনলাইনে অনুষ্ঠানে যুক্ত হবেন।
বাংলাদেশের পক্ষে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল। দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা–সংক্রান্ত অনুবিভাগের প্রধান খাদিজা নাজনীন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন যুগ্ম সচিব ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ ও মুস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সচিব শেখ শামসুল আরেফীন এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কমিশনার রইছ উদ্দিন খান।
বাংলাদেশের পক্ষে উপদেষ্টার স্বাক্ষর করা চুক্তির কপি প্রতিনিধি দলের কাছে আগেই পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এতে সই করবেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রিয়ার।
চুক্তি স্বাক্ষরের আগের দিন গতকাল রোববার সচিবালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্য উপদেষ্টা জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আরোপ করা অতিরিক্ত ২০ শতাংশ শুল্ক ভবিষ্যতে আরও কমতে পারে। তবে শুল্ক কতটা কমবে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কিছু বলেননি। তাঁর মতে, আলোচনার এই পর্যায়ে নির্দিষ্ট মন্তব্য করলে দরকষাকষিতে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে শুল্ক শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। চুক্তি সম্পন্ন হলে দুই পক্ষের সম্মতিতে এর শর্তাবলি প্রকাশ করা হবে।
কেন নির্বাচনের আগে চুক্তি:
নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান সুরক্ষাই সরকারের মূল বিবেচনা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বাংলাদেশের লাখো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাঁর ভাষ্য, প্রতিযোগী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে বড় অঙ্কের পণ্য ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও জানান, আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই কিছু নথি প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। তাঁর দাবি, এসব তথ্য বাইরে না এলে শুল্ক ২০ শতাংশের নিচে নামানোর সুযোগ আরও বেশি ছিল।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় জরুরি অবস্থার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক কাঠামোর আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য সমঝোতায় যাচ্ছে। বাংলাদেশও সেই প্রক্রিয়ার অংশ। তবে আলোচনা চলাকালে নথি ফাঁস হলে দরকষাকষিতে দুর্বলতা তৈরি হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব নথি বাংলাদেশ থেকেই প্রকাশ হয়েছে। যদিও এতে দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়েছে—এমন কিছু ছিল না বলেও তিনি দাবি করেন। চুক্তি স্বাক্ষরের পর দুই পক্ষের সম্মতিতে পুরো নথি প্রকাশ করা হবে বলে পুনরায় জানান তিনি।
চুক্তি–সংক্রান্ত আলোচনার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিও উঠে আসে। শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এটি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এর আগেই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দেশের বিমান খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০৩৫ সালের মধ্যে বহরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তিনি জানান, বর্তমানে দেশের কার্যকর উড়োজাহাজ প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে বিপুলসংখ্যক যাত্রী বিদেশি এয়ারলাইন্সে যাতায়াত করছেন। নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সম্ভাব্য এই উড়োজাহাজ কেনায় ব্যয় হতে পারে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। তবে অর্থ পরিশোধ দীর্ঘ মেয়াদে কিস্তিতে করা হবে।

