আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিদায় নেবে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দায়িত্ব নেবে নতুন সরকার। বিদায়ের আগে নিজেদের কাজের হিসাব তুলে ধরতে মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টারা তাদের মন্ত্রণালয়ের সাফল্য, সীমাবদ্ধতা ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। আত্মমূল্যায়নে কেউ নিজেকে ৭০ শতাংশ, কেউ ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত সফল বললেও শতভাগ সন্তুষ্টির দাবি কেউই করেননি।
অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, নিজেকে শতভাগ নম্বর দেওয়ার মতো আত্মতৃপ্তি তার নেই। বাস্তবতার নিরিখে তিনি নিজের কাজের মূল্যায়ন ৭০ কিংবা ৮০ শতাংশের বেশি দিতে রাজি নন। তার ভাষায়, অনেক পরিকল্পনা থাকলেও সব কাজ শেষ করে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের অনিয়ম কাটিয়ে ওঠা সহজ ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন নিজের কাজের মূল্যায়নে প্রায় ৭০ শতাংশ নম্বর দেন। তিনি বলেন, আরও ভালো করা সম্ভব ছিল, কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। দেশের অস্থির সময়ে পুলিশের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি জানান, বড় আন্দোলনের মধ্যেও পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি এবং সর্বোচ্চ সংযম দেখিয়েছে। তার মতে, অন্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জনগণ শান্তিপ্রিয় ও শৃঙ্খলাবোধসম্পন্ন।
ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন নিজের সাফল্যের হার নির্ধারণ করেন ৯৫ শতাংশ। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, কবরস্থানসহ সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য সহায়তা কার্যক্রম চালানো হয়েছে। তবে প্রশাসনিক জটিলতা ও জনবল সংকটের কারণে শতভাগ সফল হওয়া সম্ভব হয়নি। আরও কিছু সময় পেলে ওয়াকফ প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যেত বলেও তিনি জানান।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, জ্বালানি খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে সময় ও বড় বিনিয়োগ দরকার ছিল, যা অন্তর্বর্তী সরকার পায়নি। তাই দেড় বছরে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন সম্ভব হয়নি। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, নির্বাচিত সরকার প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এনে এই খাতকে নতুনভাবে সাজাতে পারবে।
খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রমকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার উদ্যোগ সফল হয়নি। তবে বিদায়ের মুহূর্তে সরকারের ভেতরের মতপার্থক্য নিয়ে কথা বলে তিক্ততা বাড়াতে চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বিদায়বেলায় আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, দায়িত্বে থাকা সময়ে কোনো ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আবার নিজের কর্মজীবনে ফিরে যাবেন এবং সবাই যেন তাকে ভুলে যান—এমন অনুরোধও করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্ন ও নজরদারিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এবং বলেন, এতে নিজের ভুল সংশোধনের সুযোগ পেয়েছেন।
সব মিলিয়ে বিদায়ের প্রাক্কালে উপদেষ্টাদের এই আত্মসমালোচনামূলক বক্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

