২০১৪ সাল থেকে টানা তিনটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর এবার সুযোগ পেয়ে ভোটাররা নিজেদের রায় স্পষ্ট করেছেন। ১২ই ফেব্রুয়ারির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ভোটাররা স্পষ্ট ও শক্ত বার্তা দিয়েছেন।গভীর অর্থনৈতিক সংকট, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলার প্রেক্ষাপটে মানুষ পরিবর্তনের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। ফলাফল বলছে, জনগণ এখন স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার চায়।
দেশের দুর্বল অর্থনীতির জন্য এই নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৮ মাসের অস্থিরতা, বিচ্ছিন্ন ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ব্যবসায় আস্থা কমিয়েছে। বিনিয়োগে গতি থেমে গেছে। প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে ফল আসা শুরু হলে ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ স্বস্তি প্রকাশ করে। তাদের আশা, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দ্রুত শৃঙ্খলা ফেরাবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করবে।
ভোটাধিকারের প্রত্যাবর্তন:
এই সুস্পষ্ট রায় আবারও একটি আলোচিত বাস্তবতাকে সামনে এনেছে—বাংলাদেশের ভোটাররা সুযোগ পেলে সচেতন সিদ্ধান্ত নেন। অনেকের মতে, এই ফল ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রতীকও বটে। ২০১৪ সাল থেকে শেখ হাসিনার অধীনে টানা তিনটি নির্বাচনে প্রতিযোগিতার ঘাটতি নিয়ে সমালোচনা ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের অভ্যুত্থানে তার পতন ঘটে। এক দশকের বেশি সময় পর ভোটাররা প্রথমবারের মতো প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনে অংশ নিয়ে দৃঢ় মত প্রকাশ করেন।
ইতিহাসও একই কথা বলে। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১, ১৯৯৬ সালের জুন, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। এসব নির্বাচন দেখিয়েছে, সঠিক বিকল্প পেলে ভোটাররা রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। বৃহস্পতিবারের ফলাফলও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
২০১৪ সাল থেকে টানা তিনটি নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন। তবে এবার সুযোগ পেয়ে ভোটাররা নিজেদের রায় স্পষ্ট করেছেন।

ধর্মভিত্তিক চিন্তা নয়, স্থিতিশীল মধ্যপন্থা পছন্দ:
প্রচারণা শেষে মূল লড়াই গড়ে ওঠে তারেক রহমানর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং শফিকুর রহমানর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে।
ভোটাররা সূক্ষ্ম বার্তা দিয়েছেন। বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ দেশ হলেও কট্টর ধর্মভিত্তিক শাসন তারা চান না। বিএনপি নিজেদের বহুত্ববাদী ও তুলনামূলক মধ্যপন্থী শক্তি হিসেবে তুলে ধরে। তারা অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করে।
আসনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, জামায়াত ৬৮টি আসন এবং ৩২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে ইতিহাসের সেরা ফল করেছে। তবু তারা ক্ষমতায় যেতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ঘটনার ঐতিহাসিক সম্পৃক্ততা এবং নারীর ক্ষমতায়ন বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান অনেক ভোটারের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা সীমিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ফলাফলে উগ্র ডানপন্থী ভোটারদের উল্লেখযোগ্য সমর্থনও স্পষ্ট। জামায়াত এখন প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে সংসদে যাচ্ছে। এতে সংসদের সমীকরণ বদলাবে।
নারী ভোটারদের প্রভাব ও রাজনৈতিক প্রত্যাশা:
মোট ভোটারের অর্ধেকের বেশি নারী। ফলাফলে তাদের প্রভাব পরিষ্কার। প্রচারণায় নারীর নেতৃত্ব ও জনজীবনে অংশগ্রহণকে খাটো করে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, তা উল্টো প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
রাজনীতি ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণকে ‘নৈতিক অবক্ষয়’ আখ্যা দেওয়া অনেক নারী ও পুরুষ ভোটারই প্রত্যাখ্যান করেছেন। দেশ পরিচালনায় অংশ নিতে চাওয়া একটি দলের এমন অবস্থান পুরুষ ভোটারদেরও দূরে সরিয়েছে।
বিএনপি এই মনোভাব বুঝে প্রচার কৌশল সাজায়। তারেক রহমানের কন্যার সক্রিয় অংশগ্রহণ নারী-সমতার বার্তাকে জোরালো করেছে। এটি বৈশ্বিক জেন্ডার সমতার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সামগ্রিকভাবে বিএনপি নিজেদের নতুন রূপে হাজির করেছে। তারুণ্যনির্ভর আধুনিক প্রচার কৌশল নেওয়া হয়। তাদের মূল বার্তা ছিল দেশকে পেছনে নয়, সামনে এগিয়ে নেওয়া। ‘মবক্র্যাসি’ ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির বিপরীতে তারা স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অবস্থান জনমনে সাড়া ফেলে।
বিজয়ী ও বিজিত:
এই নির্বাচন ছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক—তারেক রহমান বনাম শফিকুর রহমান। দুজনই প্রথমবার সংসদে প্রবেশ করছেন। একজন সরকারপ্রধান হতে যাচ্ছেন, অন্যজন বিরোধীদলীয় নেতা।
লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমান দলের তৃণমূলকে উজ্জীবিত করে। মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তিনি দলের পূর্ণ দায়িত্ব নেন। দেশজুড়ে ব্যাপক প্রচার চালান। নিরঙ্কুশ বিজয়ে তার নেতৃত্ব আরও দৃঢ় হয়েছে। এখন প্রশ্ন, তিনি কি রাজনৈতিক বিজয় থেকে রাষ্ট্রনায়কত্বে উত্তরণ ঘটাতে পারবেন।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত করে এবং নির্বাচনে তাদের অযোগ্য ঘোষণা করে। এতে সৃষ্ট রাজনৈতিক শূন্যতায় জামায়াত বড় প্রত্যাশা দেখেছিল। কিন্তু তা পূরণ হয়নি। ২৮৪টি আসনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের সর্বোচ্চ সাফল্য ছিল ১৯৯১ সালে। তখন তারা ১৮টি আসন ও ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়েছিল।

দেশের রাজনৈতিক যাত্রার নতুন মোড়:
নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক মানচিত্রেও নতুন ইঙ্গিত দিয়েছে। জুলাইয়ের তারুণ্যনির্ভর গণঅভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রতিশ্রুতি নিয়ে মাঠে নামে। তবে জামায়াতের সঙ্গে কৌশলগত জোট তাদের সংস্কারবাদী ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ৩০টি আসনে লড়ে তারা মাত্র ছয়টি পায়। ভোটের হার তিন শতাংশের নিচে। ফলে বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় শক্তি হওয়ার লক্ষ্য পূরণ হয়নি। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তাদের চেয়ে একটি আসন বেশি পেয়েছেন।
একসময়কার শক্তিশালী জাতীয় পার্টি এবার প্রায় অস্তিত্ব সংকটে। ১৯৯১ সালের পর থেকে ঐতিহাসিকভাবে তৃতীয় বৃহত্তম দল হলেও, রংপুরেও তারা কোনো আসন পায়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা এবং ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর বিরোধী দলের ভূমিকা তাদের গ্রহণযোগ্যতায় প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত। ভোটাররা এবার তাদের কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
একক প্রভাবের অন্তর্নিহিত শঙ্কা:
বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেমন সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি সতর্কবার্তাও রয়েছে। অতীতে ২০০১ ও ২০০৮ সালের সরকার নিরঙ্কুশ আধিপত্যের পর ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও বিরোধী মত দমনের অভিযোগে সমালোচনার মুখে পড়ে।
১৯৯১ সালে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনে বড় বিতর্ক হয়নি। তবে ২০০১ ও ২০০৮ সালে দুই দল দুই-তৃতীয়াংশ পেয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ তখন সংকট গভীর করে।
শক্ত ম্যান্ডেট সংস্কার সহজ করতে পারে। কিন্তু সংযম ছাড়া প্রয়োগ হলে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ দুর্বল হতে পারে। নতুন সরকারের পদক্ষেপ তাই পর্যবেক্ষণে থাকবে।
সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হলে জাতীয় নির্বাচনে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়া বিএনপির প্রভাব সেখানে বাড়তে পারে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
গণতান্ত্রিক পুনর্যাত্রা নাকি নতুন মেরুকরণ:
বহু বছরের সীমিত প্রতিযোগিতার পর এই নির্বাচনকে অনেকে গণতান্ত্রিক পুনরারম্ভ হিসেবে দেখছেন। প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি নতুন গতি পেয়েছে। একই সঙ্গে রক্ষণশীল ভিত্তিতে শক্তিশালী বিরোধী পক্ষও তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি গণতন্ত্রকে শক্ত করবে নাকি সংখ্যাগুরু আধিপত্যের নতুন অধ্যায় খুলবে, তা নির্ভর করবে ক্ষমতার ব্যবহারের ওপর। ভোটাররা তাদের রায় স্পষ্ট করেছেন। এখন দায়িত্ব নেতৃত্বের।

