ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে বিএনপি। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যেই নতুন সরকারের শপথ হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার গঠনের প্রক্রিয়া সামনে এগোতেই রাজনীতিতে নতুন করে উচ্চারিত হচ্ছে একটি শব্দ—‘ছায়া মন্ত্রিসভা’। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘোষণার পর বিষয়টি ঘিরে কৌতূহল ও আলোচনা বেড়েছে।
নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। পরে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণার পর আলোচনায় আসে বিষয়টি।
এর পর এনসিপি নেতা আসিফ মাহমুদও একই ধরনের ঘোষণা দেন। আজ রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ফেসবুকে তিনি লেখেন, ‘আমরা ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত এবং সার্বিক কার্যক্রমে ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে ছায়া মন্ত্রিসভা।’
এই দুই নেতার বক্তব্য রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ছায়া মন্ত্রিসভা কী, কীভাবে গঠিত হয় এবং এর কার্যপরিধি কতটা—এসব নিয়েই চলছে আলোচনা।
ছায়া মন্ত্রিসভা কী:
বিশ্ব রাজনীতিতে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ মূলত ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় ব্যবস্থার একটি স্বীকৃত কাঠামো। এ ব্যবস্থায় বিরোধী দল নিজেদের মধ্যে একটি সমান্তরাল মন্ত্রিসভা গঠন করে। এর লক্ষ্য হলো সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা, নীতির সমালোচনা করা এবং বিকল্প প্রস্তাব তুলে ধরা।
সাধারণত সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দল একজন করে ‘ছায়া মন্ত্রী’ মনোনয়ন দেয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত, বাজেট ও নীতিমালা বিশ্লেষণ করা তাদের দায়িত্ব। প্রয়োজনে তারা বিকল্প নীতির রূপরেখাও প্রকাশ করে।
যুক্তরাজ্যে সরকার বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়মিত সরকারের নীতি পর্যবেক্ষণ করে, সংসদে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তোলার মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে। অস্ট্রেলিয়াতেও একইভাবে বিরোধী দলের ছায়া মন্ত্রিসভা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছায়া মন্ত্রিসভা শুধু সমালোচনার প্ল্যাটফর্ম নয়। এটি বিরোধী দলের জন্য প্রশাসনিক প্রস্তুতির ক্ষেত্রও। বাজেট প্রণয়ন, নীতি বিশ্লেষণ এবং প্রশাসনিক কাঠামো বোঝার সুযোগ তৈরি হয় এই প্রক্রিয়ায়। ফলে নির্বাচনের আগে দল নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ পায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের নজির নেই। সংবিধান বা প্রচলিত কাঠামোয় এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে এই ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন।
তাদের মতে, শক্তিশালী বিরোধী ভূমিকা গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। ছায়া মন্ত্রিসভা সেই ভারসাম্য তৈরির একটি কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে। বিশেষ করে যখন সরকারের নীতির পর্যবেক্ষণ জটিল হয়ে ওঠে, তখন বিকল্প কাঠামো হিসেবে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ছায়া মন্ত্রিসভার কাজ ও এখতিয়ার: উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ছায়া মন্ত্রিসভার প্রধান কাজগুলো হলো—
১. সরকারের কর্মকাণ্ডে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
২. বিকল্প বাজেট প্রস্তাব তৈরি করা
৩. প্রশাসনিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা
৪. ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তোলা
নতুন সরকারের শপথের প্রাক্কালে ছায়া মন্ত্রিসভা নিয়ে এই আলোচনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিষয়টি বাস্তবে রূপ পায় কি না, তা সময়ই বলে দেবে।

