ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২৯০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে। সমন্বিতভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫১.১ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে, ২২৭টি আসনে প্রার্থী দেওয়া জামায়াতে ইসলামী ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জোটভিত্তিক হিসেবে ৩৮.৫ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে।
তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে এনসিপি, যারা ৩২ আসনে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ৩.০৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে। চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন ২৫৭ আসনে প্রার্থী দিয়ে ২.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সীমিত প্রভাব দেখিয়েছে। ৩৪টি আসনে প্রার্থী থাকা বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.০৯ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে।
এছাড়া নির্বাচনে অংশ নেওয়া বাকি ৪৫টি দলের মধ্যে অনেকের ভোট অংশগ্রহণ ১ শতাংশের কম। গত তিন সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ১৯৯ আসনে প্রার্থী দিয়ে মাত্র ০.৮৯ শতাংশ ভোট পায়। জামায়াত জোটের খেলাফত মজলিসের অপরাংশ ২০ আসনে প্রার্থী রেখে ০.৭৬ শতাংশ ভোট অর্জন করেছে।
নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। মোট ভোটারের ৬৮ শতাংশ হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন। হ্যাঁ ভোট জয়ের কারণে ভোটের অনুপাতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। তবে বিএনপি জানিয়েছে, তারা নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠন করবে, ভোটের অনুপাতে নয়, বরং আসনের অনুপাতে আসন ভাগাভাগি করবে। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ অবস্থান গত শনিবারও পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
জুলাইয়ে জারি করা আদেশে বলা হয়েছিল, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ আসনের সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার অনুমোদন লাগবে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্ম কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষক, নিয়ন্ত্রক, ন্যায়পাল ও দুর্নীতি দমন কমিশনে নিয়োগসহ বিভিন্ন পদ তৈরি হবে।
বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্টের কারণে এই আটটি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ছাড়া বাকি সাতটিতে তাদের স্বতন্ত্র অবস্থান আছে।
উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন:
নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসের সম্মিলিত ভোট ৮৯.৫৭ শতাংশ। বাকি ৪৫টি দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী পেয়েছে ১০.৪৩ শতাংশ ভোট, যার মধ্যে স্বতন্ত্ররা পেয়েছে ৫.৭৯ শতাংশ।
সংবিধান সংশোধন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষে আসনের জন্য একটি দলকে কমপক্ষে ১ শতাংশ ভোট পেতে হবে। এ হিসাব অনুযায়ী, বিএনপি ৫৫.৭৮, জামায়াত ৩৫.৪৫, এনসিপি ৩, ইসলামী আন্দোলন ৩.০১ এবং খেলাফত মজলিস ২.৩৩ আসন পাবেন। আসন পূর্ণসংখ্যায় রূপান্তরে বিএনপি ৫৬, জামায়াত ৩৬, এনসিপি ৩, ইসলামী আন্দোলন ৩ এবং খেলাফত মজলিস ২ আসন পাবেন।
বর্তমান সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত আসনও পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে বণ্টিত হয়। ভগ্নাংশ বড় হলে পূর্ণ আসন দেওয়া হয়। তবে বিএনপি সংসদের আসনের অনুপাতে উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন করতে চায়। এ পদ্ধতিতে প্রতি তিন আসনের জন্য একটি আসন বরাদ্দ হবে। ফলে খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলন উচ্চকক্ষে আসন পাবেন না।
জুলাই সনদের ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের ৩০টিতে সব দলের ঐকমত্য রয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ের কারণে এগুলো বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক। প্রথম দুই ভাগের আট সংস্কার প্রস্তাবও হ্যাঁ ভোটে বাধ্যতামূলক হয়েছে। তবে বিএনপি ও অন্যান্য দলের নোট অব ডিসেন্ট থাকা ১০টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন ঐচ্ছিক থাকবে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, “জুলাই সনদে বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্টের কারণেই গণভোট হয়েছে। যদি সব দল একমত থাকত, গণভোটের প্রয়োজন হতো না। ভোটে ৬৮ শতাংশ হ্যাঁ আসার মাধ্যমে প্রথম আটটি সংস্কার প্রস্তাবে থাকা নোট অব ডিসেন্ট প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।”
সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার জানান, গণভোটে প্রথম দুই ভাগের ৮টি এবং তৃতীয় ভাগের ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাধ্যতামূলক। বাকিরা দলের নোট অব ডিসেন্ট অনুযায়ী বাস্তবায়ন বা অব্যাহত রাখা যাবে। হ্যাঁ ভোট জয়ের ফলে ৩৮টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের রাজনৈতিক ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এছাড়া নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে সক্ষম হবে।

