ঢাকায় কাক যেন এখন বিরল। বহু বছর ধরে আমার পাখিপ্রেমী বন্ধুরা এই চেনা নগরীতে পাখিটির ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়া নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছিলেন। শুরুতে আমি তাদের আশঙ্কাকে গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু ২০২৪ সালে স্কটল্যান্ড থেকে ফিরে আসার পর থেকে আমিও এক মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ্য করেছি—আমার বাসার আশপাশের সকালের শব্দভূমি অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।
বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় মানুষ থমকে দাঁড়িয়ে একই প্রশ্ন করছেন—কাকগুলো গেল কোথায়?
এক সময় ঢাকার ভোর মানেই ছিল এক স্বতন্ত্র কোলাহল—হর্ন বা ড্রিল মেশিনের শব্দ নয়, কা কা রব। ছাদ, বৈদ্যুতিক তার আর কংক্রিটের জঙ্গলের ফাঁকে টিকে থাকা অল্প সবুজে ডজন ডজন কাকের আনাগোনা ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। সকালে তারা কাচাবাজার আর ডাস্টবিনের ওপর চক্কর দিত, উচ্ছিষ্টের ভাগ নিয়ে ঝগড়া করত, আর অদ্ভুত কিছু দেখলেই সেটা নিয়ে কৌতূহল মেটাত। সন্ধ্যা নামলে বড় বড় ঝাঁকে জড়ো হয়ে কোলাহল তুলে ফিরত বাসায়। ঢাকার মানুষের কাছে কাক ছিল এক অবিচ্ছিন্ন উপস্থিতি—বিরক্তিকর, পরিচিত, অথচ সদা দৃশ্যমান।
কিন্তু তাদের হারিয়ে যাওয়াটা ঘটেছে নিঃশব্দে। যেমনটি শহুরে পরিবেশগত সংকটে প্রায়ই দেখা যায়—একদিন ছাদে একটি পাখি কম, আরেকদিন হয়তো খেয়াল করলে সন্ধ্যার দলবদ্ধ কোলাহল নেই কাকেদের। বিজ্ঞান এনিয়ে তথ্য জোগাড় করার আগেই মানুষ সেই অনুপস্থিতি টের পায়। এই লেখা লিখতে লিখতেই সকালের বাইরের পরিবেশে কাকের অনুপস্থিতি অস্বস্তিকরভাবে স্পষ্ট অনুভব করছিলাম।
শহরের জন্য জন্মানো এক পাখি
বিশ্বজুড়ে কাকের প্রজাতি প্রায় ৪০ থেকে ৪৭টি; অ্যান্টার্কটিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার অধিকাংশ অংশ ছাড়া—-প্রায় সব মহাদেশেই তাদের দেখা মেলে। হিমালয়ের উচ্চভূমি থেকে উত্তর সাগরের তীর, দূরবর্তী প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ থেকে মধ্য আমেরিকার ঘন জঙ্গল—সবখানেই কাকের বিচরণ।
সব কাকই উন্নত জ্ঞান-ক্ষমতা ও জটিল সামাজিক আচরণের জন্য পরিচিত, যা হাজারো বছর ধরে মানুষের কৌতূহলের বিষয়বস্তু হয়েছে। নব্বইয়ের দশকে মা প্রথম আমাকে তাদের বুদ্ধিমত্তার এক ঝলক দেখান। তিনি ছাদে একটি খুঁটির সঙ্গে বাঁধা কালো কাপড় নাড়াতেই মুহূর্তের মধ্যে প্রায় একশ’ পাতিকাক জড়ো হয়েছিল—স্পষ্টতই উত্তেজিত হয়ে; তারা মনে করছিল যেন তাদেরই একজন বিপদে পড়েছে।
কাকের বুদ্ধিমত্তা মানব সংস্কৃতিকেও প্রভাবিত করেছে। ভুটানের জাতীয় পাখি হলো দাঁড়কাক , যা জ্ঞান, কর্তৃত্ব ও সুরক্ষার প্রতীক। এমনকি ‘র্যাভেন ক্রাউন’—যার শীর্ষে দাঁড়কাকের মাথার প্রতিরূপ বসানো—ভুটানের রাজা বা ড্রাগন কিংদের মুকুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
কাকের লাতিন নাম Corvus—যা ৮৮টি নক্ষত্রমণ্ডলের একটির নামও। কাকের অনেক প্রজাতি মানুষের পাশেই টিকে থাকার বৈশিষ্ট্য আয়ত্ত করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাতিকাক (Corvus splendens) দীর্ঘদিন ধরে নগর বসতিগুলোয় বসবাস করেছে, বংশবিস্তার করেছে। উচ্ছিষ্ট খেয়ে, রাস্তার পাশের গাছে বাসা বেঁধে, জনবহুল বসতির প্রাচুর্যকে কাজে লাগিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বেড়েছে। বড় ঠোঁটওয়ালা বা দাঁড়কাক (Corvus macrorhynchos)-ও একইভাবে টিকে থাকে, যদিও তারা তুলনামূলক সবুজের অংশ বেশি এমন শহরই পছন্দ করে।
ঠিক এই কারণেই কাকেদের সংখ্যায় পতন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এরা সংবেদনশীল বনাঞ্চল নির্ভর বা পরিযায়ী বিরল প্রজাতি নয়। এরা টিকে থাকার প্রতীক। যদি এমন পাখিও কোনো শহরে টিকতে না পারে, তবে সেটি নগর প্রতিবেশ ব্যবস্থার গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়—যার প্রভাব কেবল পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
কী বদলেছে?
ঢাকায় কাক কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। বরং একাধিক চাপ একসঙ্গে কাজ করছে—প্রতিটিই আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও একসঙ্গে শক্তিশালী।
প্রথমত, আবাসস্থল হারানো। শহরের গাছে সহজেই বাসা বাঁধা প্রজাতি হয়েও কাক নিরাপদ নয়। ২০০০-এর দশকের শুরু পর্যন্ত ঢাকার বহু বাসায় ছিল আঙিনা, বাড়ির পেছনের বাগানে—আম, মেহগনি, রেইনট্রি নানান ধরনের গাছ। মূল ঢাকা শহরের সীমানার বাইরে চারদিকেই ছিল বিস্তীর্ণ জলাভূমি।
কিন্তু এসব ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। সড়ক প্রশস্তকরণ, ফ্লাইওভার, আবাসন প্রকল্প উন্নয়ন আর তথাকথিত ‘সৌন্দর্যায়ন’ প্রকল্পে গাছের ছায়ার চেয়ে কংক্রিটের সরল রেখাই অগ্রাধিকার পেয়েছে। প্রায়ই কাকেদের বাসা বাঁধার মৌসুমেই গাছ ছাঁটাই করা হয়, এতে বাসা নষ্ট হয়, পাখিগুলো আর ফিরে আসে না। যেমন আমার বাসার আশপাশে ৫০০ মিটারের মধ্যে দশটিরও কম গাছ আছে—তার বেশিরভাগই দুর্বল ও চিকন।
কাক শহর সহ্য করতে পারে, কিন্তু বাসা বাঁধা ও রাত কাটানোর জায়গা তো চাই। তা হারালে পাখিও হারায়।
দ্বিতীয় চাপ খাদ্যের প্রাপ্যতা ও মান। ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দ্রুত বদলেছে। একসময় খোলা ডাস্টবিন আর উন্মুক্ত ময়লা ছিল কাকের ভোজনশালা। এখন কেন্দ্রীভূত কাভার্ড বিন, কমপ্যাকশন সিস্টেম ও দ্রুত বর্জ্য অপসারণ চালু হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি অগ্রগতি হলেও—শহুরে উচ্ছিষ্টভোজী পাখির জন্য বড় খাদ্য উৎস হারিয়ে গেছে।
অন্যদিকে যা উন্মুক্ত আছে, তা প্রায়ই বিপজ্জনক—প্লাস্টিক, রাসায়নিক বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জ্য, দূষিত উচ্ছিষ্ট। কাক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এসব গ্রহণ করে বিষক্রিয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে, যা তাদের বেঁচে থাকা ও প্রজননে প্রভাব ফেলছে।
বায়ুদূষণ ও তাপচাপ আরেক স্তর যোগ করেছে। ঢাকা প্রায়ই বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকে। সূক্ষ্ম দূষণকণা মানুষের মতো পাখিরও শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে, আয়ু কমায়। কংক্রিট, যানজট ও সবুজ কমে যাওয়ায় শহরের তাপমাত্রা বেড়েছে—যা বাসা বাঁধা পাখির জন্য কঠিনতর পরিবেশ তৈরি করে।
সবশেষে আছে মানুষের অসহিষ্ণুতা। শহর যত নিয়ন্ত্রিত ও ‘পরিষ্কার’ হচ্ছে, ততই অযাচিত প্রাণীর জন্য জায়গা কমছে। কাককে অনেকে নোংরা, কোলাহলপূর্ণ বা আক্রমণাত্মক মনে করেন। বাসা ভাঙা, তাড়িয়ে দেওয়া, কখনও নিপীড়ন—মানুষের মধ্যে এসব প্রবণতা বাড়ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে আমার বাসার পাশে নিম ও কাঁঠাল গাছে এক জোড়া দাঁড়কাক কয়েকদিনের জন্য বসতি গড়েছিল। তাদের গভীর ডাক শুনে প্রতিবেশীরা বিরক্তি প্রকাশ করেন; কেউ কেউ তাড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলেন।
অনুপস্থিতির মূল্য
পরিবেশগত দৃষ্টিতে কাক হলো মৃত বা উচ্ছিষ্টভোজী—যারা জৈব বর্জ্য সরায়, মৃতদেহ সরিয়ে দেয়, পুষ্টি পুনর্ব্যবহার চক্রে অবদান রাখে। সামাজিক দৃষ্টিতে তারা স্মৃতি, ভাষা ও দৈনন্দিন জীবনের অংশ। ঢাকায় তারা একসময় সর্বত্র ছিল।
তাদের হারিয়ে যাওয়া শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, সাংস্কৃতিক মুছে যাওয়াও।
বয়োজ্যেষ্ঠরা স্মরণ করেন সন্ধ্যায় হাজার হাজার কাকের দলবদ্ধ আবাস, গাছে অন্ধকার নেমে আসা, আকাশ ভরানো শব্দ। রিকশাচালকেরা বলেন, পথের ধারে উচ্ছিষ্ট দিলে কাকেরা ভিড় করত। ভবনের কেয়ারটেকাররা স্মরণ করেন ছাদে জোড়ায় জোড়ায় কাকের বাসা তৈরির ঘটনা।
এগুলো বৈজ্ঞানিক জরিপ নয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। পরিবেশবিদরা ‘সামাজিক স্মৃতি’র গুরুত্ব স্বীকার করেন—কোনো ভূদৃশ্য একসময় কেমন ছিল, মানুষ তা মনে রাখে। মানুষ হয়তো পাখি গুনে না, কিন্তু শব্দ থেমে গেলে টের পায়।
কাকের অনুপস্থিতি শুধু একটি পরিচিত পাখির হারিয়ে যাওয়া নয়; এটি শহুরে জীববৈচিত্র্যের সরলীকরণের লক্ষণ—যেখানে শহর অনিয়ন্ত্রিত জীবনের জন্য অনুকূল থাকে না।
নগর প্রতিবেশ ব্যবস্থা সহনশীলতা হারালে তা ভঙ্গুর হয়, আঘাত সামলানোর ক্ষমতা কমে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শহর কী হতে পারবে তার পরিধি সংকুচিত হয়। কাকহীন শহর হয়তো পরিষ্কার, নীরব, নিয়ন্ত্রিত দেখায়—কিন্তু তা কম জীবন্ত; অনেকটা অস্কার ওয়াইল্ডের বর্ণিত দৈত্যের বাগানের মতো।
বিলুপ্ত নয়, কিন্তু অবিনাশীও নয়
স্পষ্ট করা জরুরি—ঢাকা থেকে কাক এখনো পুরোপুরি উধাও হয়নি। বাজার, নদীতীর বা কম পরিচর্যায় থাকা এলাকায় এখনও তাদের দেখা মেলে। কিন্তু তাদের অসম বণ্টনই একটি গল্প বলে দেয়। যেখানে গাছ আছে, যেখানে বর্জ্য আছে, যেখানে বিঘ্ন কম—সেখানে কাক টিকে আছে। অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ছে নীরবতা।
এই ধারা শুধু ঢাকার নয়। হাওয়াইয়ান কাক ২০০২ সালে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলুপ্ত হয়—আবাসস্থল হারানো, বহিরাগত প্রজাতির শিকার ও রোগের কারণে। এখন তারা কেবল বন্দিদশায় টিকে আছে। যুক্তরাজ্যে কাকের আরেক প্রজাতি– রেড বিলড চফ ঐতিহ্যগত গবাদি পশু চরানো কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে হারিয়ে গেছে; কারণ ছোট ঘাসভূমি না থাকায় তাদের খাদ্য কমেছে। উভয় ক্ষেত্রেই পতন ছিল ধীর, আর তার উপলব্ধি এসেছে দেরিতে।
নিয়মিত নগর পাখি পর্যবেক্ষণ না থাকায় ঢাকায় কাকের প্রকৃত পতনের পরিমাণ নথিভুক্ত হয়নি। তথ্যের এই অনুপস্থিতিই অনেক কিছু বলে। সাধারণ প্রজাতি বিলুপ্তপ্রায় না হওয়া পর্যন্ত নগর জীববৈচিত্র্য প্রায়ই গুরুত্ব পায় না।
বিশ্বজুড়ে গবেষকেরা সতর্ক করছেন—শহরগুলো জীববৈচিত্র্যহীন মরুভূমিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে, যেখানে কেবল কয়েকটি অভিযোজিত প্রজাতি টিকে থাকবে। বিশ্বের দ্রুতবর্ধনশীল মহানগরীর একটি হিসেবে ঢাকা এই পরিবর্তনের সামনের সারিতেই আছে।
নীরবতার শব্দ শোনা
ঢাকার কাক হারানোর গল্প নস্টালজিয়া নয়। কাক খুব আদরের ছিল না—সহ্য করা হতো, নিয়ে হাসাহাসি হতো, কখনও তাড়ানো হতো। তবু তারা টিকে ছিল, নগর বিশৃঙ্খলায় অসাধারণ অভিযোজন ক্ষমতা দেখিয়ে। তাদের পতন ইঙ্গিত দেয়, আমরা যতটা বুঝি তার চেয়ে দ্রুত, কঠোর ও নির্মমভাবে বদলাচ্ছে ঢাকা।
শহরকে প্রায়ই মাপা হয় তারা কী নির্মাণ করেছে—সড়ক, টাওয়ার, ফ্লাইওভার দিয়ে। কিন্তু তাদের বিচার হওয়া উচিত তারা কী হারিয়েছে তা দিয়েও। যে পাখি একসময় শব্দভূমি নির্ধারণ করত, তার অনুপস্থিতি আত্মসমালোচনার দাবি রাখে। আমার রুয়ান্ডার কিগালির কথা মনে পড়ে—অসাধারণ জীববৈচিত্র্য আর ভোরবেলার হাদাদা আইবিসের জোরালো ডাক। আমরা সহকর্মীরা তাদের ডাকনাম দিয়েছিলাম ‘অ্যালার্ম বার্ড’। অথচ ঢাকার জৈবিক অ্যালার্ম যেন স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো—আমরা কি আদৌ তা নিয়ে ভাবছি?
সূত্র: টিবিএস

