বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনে ‘শুদ্ধি অভিযান’ বললেই যে নামটি অনেকের মনে ভেসে ওঠে, তিনি আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে নকলের বিরুদ্ধে তার কঠোর অবস্থান এবং ঝটিকা অভিযানে হেলিকপ্টার ব্যবহারের কারণে তিনি পেয়েছিলেন ‘হেলিকপ্টার মিলন’ উপাধি। দীর্ঘ বিরতির পর আবারও দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নেতৃত্বের আসনে ফিরেছেন তিনি।
তবে এবারের বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এখন শুধু নকল প্রতিরোধ নয়; বরং শিক্ষা কাঠামোর গভীর সংকট, কারিকুলাম বিতর্ক, আদালতে আটকে থাকা হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক পদ এবং ডিজিটাল প্রজন্ম ‘জেনারেশন আলফা’র উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
বর্তমান শিক্ষা খাতকে তিনি একক কোনো সংকট নয়, বরং ‘মাল্টিপল’ বা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখে বলে মনে করেন। কারিকুলাম সংস্কার, আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা এবং প্রাথমিক শিক্ষায় ৩২-৩৫ হাজার প্রধান শিক্ষক পদ আদালতে আটকে থাকা—সবকিছুই একসঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে।
তার ভাষায়, তারা বসে নেই; ইতোমধ্যে ‘হোমওয়ার্ক’ সম্পন্ন হয়েছে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচনী ইশতেহারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা ও প্রাথমিক শিক্ষা—এই দুই মন্ত্রণালয়কে এক ছাতার নিচে আনার সিদ্ধান্তকে তিনি ‘ইউনিক আইডিয়া’ হিসেবে দেখছেন। আগে আলাদা মন্ত্রী ও কাঠামোর কারণে সমন্বয় ঘাটতি ছিল বলে তার দাবি।
এখন ডিভিশন থাকলেও মন্ত্রিত্ব আলাদা নয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণ দ্রুততর করতে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন—কোনো ফাইল ৭২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকবে না। এমনকি তিনি দেশের বাইরে থাকলেও সাত ঘণ্টার বেশি ফাইল ঝুলে থাকবে না; সরাসরি প্রতিমন্ত্রীর কাছে যাবে। প্রশাসনিক জট কমিয়ে গতিশীলতা বাড়ানোই তার লক্ষ্য।
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি পুরোপুরি বদলে ফেলার পক্ষে নন তিনি। তার মতে, শিক্ষানীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত রিভিউ ও আপডেট করাই প্রয়োজন, সব ভেঙে নতুন করে শুরু নয়।
নতুন প্রজন্মের মেধা নিয়ে তিনি আশাবাদী। তার মতে, জেনারেশন আলফার মধ্যে মেধার কোনো ঘাটতি নেই; বরং অভিভাবক, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্র পরিচালকদের দিকনির্দেশনার ঘাটতিই বড় সমস্যা।
শিশু-কিশোররা অত্যন্ত অ্যাডাপটিভ, দ্রুত শিখতে সক্ষম এবং তাদের ‘ব্রেইন স্পেস’ বিশাল—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ব্যর্থতার দায় শিক্ষার্থীদের নয়, নেতৃত্বের।
এসএসসি-এইচএসসিতে গণিত ও ইংরেজিতে মফস্বল এলাকার ফল খারাপ হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি মনিটরিং ঘাটতির কথা বলেন। শহরে অভিভাবকদের তদারকি বেশি, উচ্চাকাঙ্ক্ষাও বেশি। গ্রামে সেই তদারকি ও রাষ্ট্রীয় নজরদারি তুলনামূলক কম—ফলে ফলাফলেও প্রভাব পড়ে।
দেশে ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রির অভিযোগ নিয়ে তিনি আপসহীন। তার মতে, আগে দেশে থাকা সব পিএইচডি ডিগ্রিধারীর একটি সঠিক তালিকা তৈরি করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। প্রয়োজনে বিশেষ কমিটি গঠনের কথাও বলেছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, যারা পিএইচডি ডিগ্রি প্রদান করেন, তাদের নিজের যোগ্যতাও খতিয়ে দেখা দরকার—এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, যার নিজের পিএইচডি নেই, তিনি কীভাবে অন্যকে পিএইচডি করান—এ প্রশ্ন এড়ানো যায় না।
আগামী এক বছরে বড় পরিবর্তনের প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বলেন, এখানে কোনো ম্যাজিক নেই। তার মূল শক্তি ইচ্ছাশক্তি, একাগ্রতা ও সততা। ২৪ ঘণ্টা কাজ করতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। বছরে ৩৬০ দিনের বেশি কাজ করতে তার আপত্তি নেই—এমন দৃঢ় প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য তার স্পষ্ট বার্তা—ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ নেই। পড়াশোনায় মনোযোগী হতে হবে, সময় দিতে হবে। নৈতিকতা, আদর্শ ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এনটিআরসি সুপারিশপ্রাপ্ত কারিগরি শিক্ষকদের যোগদানের দিন থেকে বেতন না পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নীতিগতভাবে কাজ শুরুর দিন থেকেই পারিশ্রমিক পাওয়ার কথা। কোথাও ব্যত্যয় থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।

