বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণে সাম্প্রতিক “মব” সহিংসতার ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন আইনশৃঙ্খলা ভাঙনের উদাহরণ নয়—এটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার হৃদয়ে আঘাত। আদালত কেবল একটি ভবন নয়; এটি আইনের শাসনের প্রতীক, নাগরিকের শেষ আশ্রয়, যেখানে আবেগ নয় প্রমাণ কথা বলে, প্রতিশোধ নয় বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেই আদালতই যদি জনতার ক্রোধ, উন্মত্ততা ও অবাধ শক্তির সামনে অসহায় হয়ে পড়ে, তবে প্রশ্ন জাগে: আমরা কি এখনও আইনের শাসনে বাস করছি, নাকি ভিড়ের শাসনে?
মব কোনো নৈতিক সত্তা নয়। মবের কোনো বিবেক নেই, কোনো দায়িত্ব নেই, কোনো বিচারবোধ নেই। সেখানে ব্যক্তি হারিয়ে যায়, থাকে শুধু উত্তেজিত শক্তির অন্ধ স্রোত। ইতিহাস সাক্ষী মব কখনো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে না; মব কেবল ধ্বংস ডেকে আনে। আদালত যদি মবের সামনে মাথা নত করে, তবে আইন বইয়ের অক্ষরগুলো কেবল কাগজে বন্দি থেকে যায়।
আদালতের কাজ জনমতকে সন্তুষ্ট করা নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। অনেক সময় প্রকৃত বিচার জনতার প্রত্যাশার বিপরীতও হতে পারে—কারণ বিচার আবেগে নয়, আইনে পরিচালিত হয়। কিন্তু যখন আদালত প্রাঙ্গণেই ভয়, হামলা, ভাঙচুর বা হুমকির পরিবেশ তৈরি হয়, তখন বিচারক, আইনজীবী, সাক্ষী—সবাই নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষ বিচার কীভাবে সম্ভব?
বরিশালের ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক এই কারণে যে, এটি একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। যদি একবার প্রমাণিত হয় যে সংগঠিত জনতা আদালতের কার্যক্রম প্রভাবিত করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে যে কোনো পক্ষ নিজেদের স্বার্থে একই পথ বেছে নেবে। তখন আদালত আর আইনের আদালত থাকবে না—পরিণত হবে শক্তির মঞ্চে।
রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হলো আদালতের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আদালতকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নয়; এটি নাগরিকের ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষা করা। আদালত ভেঙে পড়লে গণতন্ত্রও ভেঙে পড়ে, কারণ বিচারবিহীন স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত শক্তিশালীর স্বাধীনতায় পরিণত হয়।
এই ঘটনার পর সবচেয়ে জরুরি বার্তা হওয়া উচিত—কোর্ট কখনোই মবের শিকার হতে পারে না, হওয়া চলেও না। আদালত যদি ভয় পায়, তবে সমাজ ভয় পায়; আদালত যদি নীরব হয়, তবে ন্যায় নীরব হয়। তাই অপরাধী যেই হোক, যত শক্তিশালীই হোক, আদালত প্রাঙ্গণে সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
ন্যায়বিচার সভ্যতার সবচেয়ে বড় অর্জন। সেটিকে রক্ষা করা শুধু বিচারকদের নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কারণ আদালত বাঁচলে ন্যায় বাঁচবে—আর ন্যায় বাঁচলে তবেই রাষ্ট্র বাঁচবে।

