নেতার চলন্ত গাড়ির পেছনে একদল কর্মীর ধুলো উড়িয়ে প্রাণপণ দৌড়ানোর দৃশ্যটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক অতি পরিচিত কিন্তু গ্লানিকর অধ্যায়। বিশেষ করে ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের যে স্বপ্ন তরুণ প্রজন্ম দেখছে, সেখানে এই দৃশ্যটি কেবল বেমানান নয়, বরং চরমভাবে অবমাননাকর।
এই প্রথাটি মূলত একটি সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে নেতাকে মনে করা হয় একাধিপতি আর কর্মীদের মনে করা হয় অনুগত ভৃত্য। সভ্য সমাজে এই আচরণের কোনো আবেদন নেই, কারণ এটি মানুষের মৌলিক মর্যাদা বা হিউম্যান ডিগনিটি রক্ষা করে না। বরং এটি প্রমাণ করে যে, আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে এখনো মেধার চেয়ে তোষামোদি এবং আদর্শের চেয়ে শারীরিক কসরতকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বাস্তব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কর্মীরা কেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির পেছনে দৌড়ায় তার পেছনে রয়েছে এক ধরণের গভীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং বৈষয়িক লাভের অংক।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সমাবেশে বা নেতার উপস্থিতির সময় দেখা গেছে, কর্মীরা জানালার কাঁচ ছুঁয়ে বা গাড়ির একদম ঘেঁষে দৌড়াতে থাকে। এর মূল কারণ হলো ‘দৃশ্যমান হওয়ার রাজনীতি’। ডিজিটাল যুগে প্রতিটি কর্মীর লক্ষ্য থাকে নেতার নিজস্ব ফটোগ্রাফার বা মিডিয়ার ক্যামেরায় নিজের মুখটি দেখানো। এই ছবি বা ভিডিও পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করে তারা প্রমাণ করতে চান যে, তারা নেতার কতটা ঘনিষ্ঠ।
এটি তাদের জন্য এক ধরণের রাজনৈতিক বিনিয়োগ, যার বিনিময়ে তারা ভবিষ্যতে পদ-পদবি, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি বা অন্যান্য ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার আশা করেন। যখন মেধা বা যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন বন্ধ হয়ে যায়, তখনই কর্মীরা এমন সস্তা পথে নেতার মন জয়ের চেষ্টা করেন।
এই আচরণ সমাজে অত্যন্ত নেতিবাচক এবং বিপজ্জনক বার্তা প্রেরণ করে। এটি নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা দেয় যে, বড় হতে হলে কারো পেছনে অন্ধভাবে দৌড়াতে হবে এবং নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে হবে। একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে নেতার কাজ হলো পথ দেখানো, আর কর্মীর কাজ হলো সেই পথ ধরে সমাজ সংস্কার করা।
কিন্তু যখন কর্মীরা গাড়ির পেছনে দৌড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতি একটি সার্কাস বা তামাশা হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এটি সাধারণ নাগরিকদের মনে রাজনীতির প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে এবং মেধাবীদের এই অঙ্গন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ‘নতুন বাংলাদেশ’ যেখানে বৈষম্যহীনতা এবং মানবিক মর্যাদার কথা বলে, সেখানে একজন মানুষের অন্য মানুষের গাড়ির ধোঁয়া খেয়ে পেছনে দৌড়ানো সেই স্বপ্নের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
প্রকৃত নেতার বৈশিষ্ট্য কখনোই এমন হতে পারে না- যা তার অনুসারীদের অবমাননা করে। একজন সংবেদনশীল এবং আদর্শবান নেতা কখনোই তার কর্মীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ির পেছনে দৌড়াতে দেখে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক নেতা একে নিজের ‘জনপ্রিয়তা’ বা ‘পাওয়ার’ প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। এটি এক ধরণের মানসিক অসুস্থতা বা আত্মরতি, যেখানে নেতা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করতে কর্মীদের ছোট করতেও দ্বিধা করেন না।
অথচ প্রকৃত নেতৃত্ব হওয়া উচিত ছিল এমন, যেখানে নেতা গাড়ি থামিয়ে কর্মীদের বলবেন, “তোমরা আমার পেছনে দৌড়াবে না, বরং আমার পাশে হেঁটে মানুষের কল্যাণে কাজ করো।” নেতৃত্বের এই দেউলিয়াত্বই মূলত এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রেখেছে।
সংগঠন হওয়া উচিত ছিল উচ্চতর আদর্শ, কঠোর নিয়ম এবং মেরুদণ্ড সোজা রাখা মানুষদের নিয়ে। কিন্তু দৌড়ানোর এই সংস্কৃতি প্রমাণ করে যে, সংগঠনের ভেতরে চাটুকারদের আধিপত্য বেশি। যারা দৌড়ায়, তারা মূলত নিজেদের অক্ষমতা ঢাকতে এই শারীরিক শ্রমের আশ্রয় নেয়।
অন্যদিকে, যারা মেধাবী এবং নীতিবান, তারা এমন অপমানজনক কাজ করতে পারেন না- বলে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এর ফলে দলে এমন এক শ্রেণীর নেতৃত্ব তৈরি হয় যারা কেবল হুকুম পালন করতে জানে, কিন্তু সৃজনশীল বা গঠনমূলক কোনো চিন্তা করতে পারে না। এটি একটি জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এখান থেকেই জন্ম নেয় স্বৈরাচারী মানসিকতা।
পরিশেষে বলা যায়, এই ‘রানিং প্রটোকল’ কালচার বন্ধ হওয়া জরুরি। নতুন বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে যে, যারা নেতার পেছনে দৌড়াবে বা সস্তা শো-ডাউন করবে, তাদের সংগঠনে কোনো স্থান নেই।
কর্মীদের বুঝতে হবে যে, তারা কোনো রাজকীয় প্রজার লাঠিয়াল বাহিনী নয়, বরং তারা পরিবর্তনের কারিগর। সম্মান অর্জন করতে হয় কাজের মাধ্যমে, নেতার গাড়ির গ্লাস ছুঁয়ে নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত এই দাসত্ব মানসিকতা দূর না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত গণতন্ত্র বা মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। রাজনীতি হোক মেধার, ত্যাগের এবং আত্মসম্মানের—কোনো অন্ধ আনুগত্য বা দৌড়াদৌড়ির নয়।

