ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ১২ মার্চ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই অধিবেশনের প্রথম বৈঠকেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হবে। এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংসদ গঠন করেছে। তাই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার বিএনপি থেকেই আসবেন—এটি প্রায় নিশ্চিত।
এ কারণে এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, বিএনপি থেকে কে বসবেন সংসদের সাংবিধানিক অভিভাবকের আসনে।
দলীয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পরই গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। মন্ত্রিসভা ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। তবে স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, ডেপুটি লিডার অব দ্য হাউস ও চিফ হুইপ—এই পদগুলোতে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এসব পদে অভিজ্ঞতা, সংসদ পরিচালনায় দক্ষতা, দলের প্রতি আনুগত্য এবং সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা—এসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে।
নীতিনির্ধারকদের মতে, কার্যকর ও প্রাণবন্ত সংসদ পরিচালনার জন্য স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদেরই বেছে নেওয়া হতে পারে। নিরপেক্ষভাবে অধিবেশন পরিচালনার সক্ষমতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার হিসেবে কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম আলোচনায় রয়েছে। তবে এখনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
সংবিধান অনুযায়ী প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। নির্বাচনের পর স্পিকার সংসদের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
বিএনপির একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, অধিবেশন শুরুর আগেই এসব পদে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে পারে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন আসবে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে।
স্পিকার পদে তিন নাম:
দলীয় মহলে স্পিকার পদে সবচেয়ে আলোচিত নাম স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান। নরসিংদী-২ আসন থেকে পাঁচবার নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য দীর্ঘদিন ধরে দলের নীতিনির্ধারণে যুক্ত। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক এবং সাবেক মন্ত্রীও। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে তিনি আলোচনায় এগিয়ে আছেন। নতুন মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় স্পিকার হিসেবে তার সম্ভাবনা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে। দলীয় সূত্র তার পরিষ্কার ভাবমূর্তি ও বিস্তৃত গ্রহণযোগ্যতার কথা বলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঈন খান বলেন, এ বিষয়ে দলের কোনও সিদ্ধান্ত তার জানা নেই। তবে দল দায়িত্ব দিলে তিনি তা গ্রহণ করবেন।
স্পিকার পদে আরেক আলোচিত নাম বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। বরিশাল-৩ আসনের এই সংসদ সদস্য সাংবিধানিক ও নির্বাচনি আইনে দক্ষ। সংসদ পরিচালনায় আইনি পারদর্শিতা গুরুত্ব পেলে তার সম্ভাবনা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের নামও আলোচনায় আছে। সাবেক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও সংসদীয় কাজের অভিজ্ঞতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রাখছে।
দলীয় সূত্র বলছে, এই তিন নেতার মধ্য থেকেই স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান।
ডেপুটি স্পিকারের সম্ভাব্য তালিকা:
ডেপুটি স্পিকার পদে আলোচনায় আছেন লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজান, ভোলা-১ আসনের ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ এবং নোয়াখালী-১ আসনের ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
দলীয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভায় নেই—এমন তুলনামূলক তরুণ ও সক্রিয় নেতাদের এই পদে আনার বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। সে কারণে এই তিনজনই আলোচনায় এগিয়ে আছেন।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদ:
ডেপুটি লিডার অব দ্য হাউস পদে প্রবীণ নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নাম বিবেচনায় রয়েছে। তিনি সাবেক প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। এ পদে না হলে তাকে অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে।
চিফ হুইপ পদে আলোচনায় আছেন দুই জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য—নোয়াখালী-২ আসনের ছয়বারের সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক এবং নোয়াখালী-৩ আসনের পাঁচবারের সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু। বিরোধী দলের চিফ হুইপ হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতার কারণে ফারুক কিছুটা এগিয়ে আছেন বলে জানা গেছে।
সংসদীয় রীতিতে চিফ হুইপকে ছয়জন হুইপ সহায়তা করেন। এসব পদে আমানউল্লাহ আমান, মোহাম্মদ ফজলুর রহমান, নুরুল ইসলাম মনি, আহমেদ আজম খান, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রেজা কিবরিয়া এবং শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের নাম আলোচনায় রয়েছে।
প্রথম অধিবেশন পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন:
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের পর প্রথম অধিবেশনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করতে হয়। প্রচলিত নিয়মে আগের সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করেন।
তবে এবার কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন। বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু বর্তমানে হত্যা মামলায় কারাগারে আছেন।
সংসদীয় বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি মনোনীত কোনও সংসদ সদস্য প্রথম অধিবেশন পরিচালনা করতে পারেন। এরপর স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

