দেশের ১২ জন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার স্বার্থে তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের দাবি জানিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে তারা গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে এই দাবি জানান। বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশে ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয় এবং ২০১৩ সালে তা সংশোধন করা হয়। দুই দশকের বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় আইনটিতে কিছু দুর্বলতা দেখা দিয়েছে। তাই আইনটি পুনঃসংশোধন ও আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কোনো আইনকে সময়োপযোগী ও কার্যকরী করার উদ্যোগ স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ জারি করে আইনকে আরও কার্যকর করেছেন। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য এই অধ্যাদেশকে স্থায়ী আইনে রূপান্তর করা জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নির্বাচিত নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনীতিবিদরা এই উদ্যোগের জন্য সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তবে অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের প্রচেষ্টা সিগারেট কোম্পানির বিভ্রান্তিকর প্রচারণায় ব্যাহত হতে পারে। তারা অভিযোগ করছে, অধ্যাদেশ আইনে রূপান্তর হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যাবে। একই ধরনের বক্তব্য তারা তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর বৃদ্ধির বিরোধিতায় ব্যবহার করে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এটি কোম্পানির পুরনো ব্যবসায়িক কৌশল, যা জনস্বাস্থ্য ও সরকারের স্বার্থে হুমকিস্বরূপ।
বিবৃতিতে ধারাবাহিক রাজস্ব বৃদ্ধির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন পাসের সময়ে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় ছিল ২ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা, পরবর্তী অর্থবছরে বেড়ে ৩ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে আইন সংশোধনের সময় রাজস্ব আয় ১০ হাজার ১৭০ কোটি টাকা, পরবর্তী বছর বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তামাক খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৪০ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত ২০ বছরে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ১৪ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই তথ্য প্রমাণ করে, তামাক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও মূল্য ও কর বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব আয় বেড়ে যায়।
তামাকজনিত ক্ষতি ও মৃত্যুহারের বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, টোব্যাকো এটলাসের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর তামাকজনিত রোগে এক লাখ ৯৯ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। পরোক্ষ ধূমপান থেকে বছরে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় এবং প্রায় ৬১ হাজার শিশু রোগাক্রান্ত হন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহারের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত খরচ হয়েছে ৮৬ হাজার কোটি টাকা, যার ৭৩ হাজার কোটি টাকা শুধু স্বাস্থ্য খাতে। একই সময়ে তামাক থেকে রাজস্ব আয় ছিল ৪১ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ তামাকজনিত ক্ষতির অর্ধেকেরও কম। তামাকজনিত রোগের চিকিৎসা খরচের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে যাচ্ছেন।
বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন মোট ১২ জন অর্থনীতিবিদ। তাদের মধ্যে রয়েছেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, অধ্যাপক ড. নাজমা বেগম, অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান, অধ্যাপক ড. মাসুদা ইয়াসমিন, অধ্যাপক ড. রুমানা হক, অধ্যাপক ড. অতনু রব্বানী, অধ্যাপক ড. শাফিউন নাহিন শিমুল, অধ্যাপক জাহিদুল কাইয়ুম, সহযোগী অধ্যাপক এস এম আব্দুল্লাহ, সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজানা করিম, সহযোগী অধ্যাপক নাজমুল হুসাইন এবং সহযোগী অধ্যাপক সেলিনা সিদ্দিকা।

