দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার পালাবদলের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল ঘটনাবহুল ও রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে বিতর্ক, বিরোধী দলের বিক্ষোভ ও ওয়াকআউট—সব মিলিয়ে বৃহস্পতিবারের অধিবেশন ছিল আলোচনার কেন্দ্রে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনে গতকাল বেলা ১১টার পর প্রবীণ সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। পরে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনয়ন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হয়।
সংসদ সচিবালয়ের নির্ধারিত কার্যতালিকা অনুযায়ী প্রথম দিনের অধিবেশন সময়ের দিক থেকে সংক্ষিপ্ত হলেও রাজনৈতিকভাবে তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সংসদের প্রথম দিনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপি এবার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। অন্যদিকে সংসদে বিরোধী দলে রয়েছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ফলে সংসদের ভেতরে রাজনৈতিক বিতর্ক বাড়ার ইঙ্গিত মিলেছে।
অধিবেশনের প্রথম দিনেই আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের এমপিরা রাষ্ট্রপতিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে সংসদ কক্ষে স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। পরে তারা ওয়াকআউট করেন। একই সময়ে সংসদ ভবনের বাইরে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতেও রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
বিরোধী দলের প্রতিবাদের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করেন। তাঁর ভাষণে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলকে ফ্যাসিবাদী বলে উল্লেখ করা হয় এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। ভাষণের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারি দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে সমর্থন জানান, তবে বিরোধী দলের আসন তখন প্রায় ফাঁকা ছিল।
অধিবেশনের সময় সংসদ কক্ষে উপস্থিত ছিলেন সদ্য সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধীরা চাইলে সংসদীয় বিধি অনুযায়ী ওয়াকআউট করতে পারেন, তবে রাষ্ট্রপতির বিরোধিতাকে তিনি স্ববিরোধিতা বলে উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নৈতিক কারণেই তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে পারেননি। তাঁর মতে, জুলাই গণহত্যার সময় রাষ্ট্রপতি কোনো প্রতিবাদ না করায় তাঁর নৈতিক অধিকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
এদিন সংসদের অধিবেশন শুরু হয় একটি ব্যতিক্রমী প্রক্রিয়ায়। আগের সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার অনুপস্থিত থাকায় স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে অধিবেশন শুরু করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাময়িকভাবে সভাপতিত্ব করেন।
তাঁর সভাপতিত্বে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন হয় এবং পরে তারা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেন। নবনির্বাচিত স্পিকারের নেতৃত্বে অধিবেশন পুনরায় শুরু হয়।
প্রথম দিকে অধিবেশনের পরিবেশ তুলনামূলক উৎসবমুখর থাকলেও রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধী দলের সদস্যরা স্লোগান দিতে দিতে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হওয়ার পর স্পিকার অধিবেশন আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন।
অধিবেশনের দিন সংসদের বাইরে রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবিতে এনসিপির নেতাকর্মীরা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার ও জুলাই গণহত্যার বিচার দাবি করেন।
এদিকে অধিবেশনের প্রথম দিনেই কারিগরি ত্রুটির কারণে সংসদের মাইক বন্ধ হয়ে যায়। এতে স্পিকারকে হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে ঘোষণা দিতে হয় এবং অধিবেশন প্রায় ২০ মিনিটের জন্য মুলতবি করা হয়।

