দেশের ব্যাংক খাত এখন মূলত ছোট ও মাঝারি আমানতকারীদের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ব্যাংকে জমা থাকা মোট অর্থের বড় অংশই এসেছে ১ কোটি টাকার কম আমানত থাকা হিসাব থেকে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষই ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট আমানতের প্রায় ৯২ শতাংশই এমন হিসাবধারীদের, যাদের জমা ১ কোটি টাকার নিচে। বিপরীতে, ১ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে মাত্র ৮ শতাংশ। এর মধ্যে আবার ২ লাখ টাকার কম জমা থাকা হিসাবেই রয়েছে মোট আমানতের ১৩ শতাংশ। আর ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকার মধ্যে থাকা আমানতই সবচেয়ে বড় অংশ—মোটের ৫৫ শতাংশ।
ব্যাংকাররা বলছেন, ছোট অঙ্কের আমানত ব্যাংকের জন্য বেশি স্থিতিশীল। এসব অর্থ একবারে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কম থাকে এবং সুদের হারও তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্যাংকের ব্যয়ও কমে। ফলে যেসব ব্যাংকের খুচরা আমানত বেশি, তাদের ভিত্তি সাধারণত শক্তিশালী হয়।
২০২৫ সালে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থাকলেও ব্যাংক খাতে আমানত বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। বছরের শেষে মোট আমানত দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ লাখ ৫০০ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১১.৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম, প্রায় ৫.৬ শতাংশ।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানত বৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল। ব্যক্তিগত বা গৃহস্থালি পর্যায়ের আমানতও বেড়েছে দ্রুত, এক বছরে যার প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৪.২ শতাংশ।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়—২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত: মোটের ১৩%, ২ লাখ থেকে ২৫ লাখ টাকা: ৫৫%, ২৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা: ১৩%, ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা: ১১%, অর্থাৎ মোট আমানতের বিশাল অংশই ছোট ও মাঝারি সঞ্চয়কারীদের হাতে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে, এক কোটি টাকার বেশি আমানতের পরিমাণ মোটের ৮ শতাংশ হলেও বড় অঙ্কের কিছু হিসাবে সাম্প্রতিক সময়ে হ্রাসের প্রবণতা দেখা গেছে। বিশেষ করে ২৫ কোটি টাকার বেশি জমা থাকা হিসাবের সংখ্যা কমেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং এবং প্রবাসী আয়ের প্রবাহ—এই তিনটি কারণে ছোট আমানত দ্রুত বাড়ছে। সহজে হিসাব খোলা এবং লেনদেনের সুবিধা সাধারণ মানুষকে ব্যাংকের দিকে আকৃষ্ট করছে। সব মিলিয়ে, দেশের ব্যাংক খাতের ভিত্তি এখন বড় আমানতকারীর ওপর নয়, বরং বিপুল সংখ্যক সাধারণ সঞ্চয়কারীর ওপর দাঁড়িয়ে আছে—যা ভবিষ্যতে আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বলে মনে করা হচ্ছে।

