দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলায় বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিয়েও অর্থ ফেরত পায়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ১২টি ব্যাংককে দেওয়া মোট ৬৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা এখনো অনাদায়ী রয়েছে, যা আর্থিক খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, এই অর্থ মূলত ৯০ দিনের জন্য স্বল্পমেয়াদি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও ব্যাংকগুলো তা পরিশোধ করতে পারেনি। সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার-এর সময়ে দেওয়া হয় ১৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, আর পরবর্তী গভর্নর আহসান এইচ মনসুর-এর সময় দেওয়া হয় আরও ৫১ হাজার কোটি টাকা।
সহায়তা পাওয়া ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক ও প্রিমিয়ার ব্যাংক। এর মধ্যে কয়েকটি ব্যাংক আগে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল বলে জানা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি এবং দুর্বল তদারকির কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। ২০২২ সালের পর থেকে এসব সমস্যা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে আমানতকারীরা টাকা তুলে নিতে থাকেন। এতে তারল্য সংকট তীব্র হয় এবং ব্যাংকগুলো বাধ্য হয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
এক পর্যায়ে কিছু ব্যাংকের চলতি হিসাব ঋণাত্মক অবস্থায় রেখেও লেনদেন চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়, যা পরে বন্ধ করা হয়। তবে কঠোর নীতি কার্যকর করায় গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে সমস্যায় পড়ে ব্যাংকগুলো। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে আবারও টাকা ছাপিয়ে সহায়তা দিতে হয়।
সবচেয়ে বেশি সহায়তা পেয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক—১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এরপর এক্সিম ব্যাংক (১২ হাজার ১০ কোটি), সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (১০ হাজার ৮৪১ কোটি), ন্যাশনাল ব্যাংক (১০ হাজার ৫৬৮ কোটি) এবং ইউনিয়ন ব্যাংক (৫ হাজার ৪২০ কোটি)। অন্যান্য ব্যাংকও কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত সহায়তা পেয়েছে।
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, এই সহায়তা মূল সমস্যার সমাধান নয়। তার ভাষায়, এটি সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখলেও ব্যাংক খাতের ভেতরের দুর্বলতা দূর করছে না। খেলাপি ঋণ, দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ না করলে দীর্ঘমেয়াদে কোনো উন্নতি সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বাধ্য হয়েই এই সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখা হবে কিনা, সে বিষয়ে নতুন গভর্নরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক বাঁচানো দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, অনাদায়ী ঋণ আদায় এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

