মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়লেও বাংলাদেশের বৈদেশিক খাত তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ঝুঁকিতে নেই এমন আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জ্বালানির দাম বাড়লেও অতিরিক্ত আমদানি ব্যয় সামাল দেওয়ার মতো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশের হাতে রয়েছে।
গতকাল জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় গভর্নর বৈদেশিক খাত নিয়ে সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি মুদ্রানীতিতে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন। তার ভাষায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে সুদের হার কমানো হবে “অবিবেচনাপ্রসূত” সিদ্ধান্ত। স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির চেয়ে মূল্যস্থিতি ধরে রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সভায় উপস্থিত ডেপুটি গভর্নররাও একই সুরে কথা বলেন। ডেপুটি গভর্নর মো. কবির আহমেদ জানান, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ রিজার্ভ দিয়ে কয়েক মাসের আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে মেটানো সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, জুনের মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে প্রায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যালান্স অব পেমেন্টের চাপ কমাতে অতিরিক্ত ২ বিলিয়ন ডলারের একটি ক্রেডিট লাইন নিশ্চিতের উদ্যোগ চলছে।
গভর্নর জানান, জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমাতে সরকার তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি চুক্তি বা অনুদানের পথ খুঁজছে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা বিভিন্ন দেশে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এছাড়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে।
তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ডেপুটি গভর্নর হাবিবুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৬২–৬৫ ডলার থাকাকালে জ্বালানি আমদানিতে বছরে প্রায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতো। বর্তমানে দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় আমদানি ব্যয়ও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকলে এই বাড়তি ব্যয় কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
গভর্নর আরও জানান, সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় আমদানি করা জ্বালানি পূর্বনির্ধারিত দামে আসায় তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কম থাকে। এসব গুরুত্বপূর্ণ আমদানি অব্যাহত রাখতে সরকার সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুল সংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে পারেন। এতে একদিকে রেমিট্যান্স কমবে, অন্যদিকে তাদের পুনর্বাসন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফ যদি জ্বালানিতে ভর্তুকি বন্ধের শর্ত দেয়, তাহলে তা মানতে হতে পারে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। তবে কর্মকর্তারা জানান, আইএমএফের সহায়তা না পেলে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি থেকেও ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
ডেপুটি গভর্নর জাকির হোসেন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘদিন উচ্চ পর্যায়ে থাকলে সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বাড়বে। বর্তমান রাজস্ব আহরণের অবস্থায় তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
অন্যদিকে, ডেপুটি গভর্নর কবির আহমেদ জানান, বর্ষা মৌসুমে আমদানি চাপ কম থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভ বাড়ানোর সুযোগ পায়। চলতি বছরও একই প্রবণতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হবে।
আর্থিক খাত সংস্কারে অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে গভর্নর বলেন, ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা হবে প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ জোরদার করা হয়েছে, এ নিয়ে নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে এবং বেশিরভাগ ব্যাংক নন-ডিসক্লোজার চুক্তিতে সই করেছে।
তিনি আরও বলেন, টেকসই বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অন্তত ৫ শতাংশের ওপরে রাখা জরুরি। কর্মসংস্থান বাড়াতে ৬০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল থেকে জুনে ঋণ বিতরণ শুরু হবে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়িয়ে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা পুনরায় চালুর জন্য ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান গভর্নর। একই সঙ্গে কৃষিভিত্তিক শিল্প ও প্রযুক্তিখাতে ঋণ বাড়ানো এবং এসএমই খাতের জন্য ভর্তুকিভিত্তিক তহবিল গঠনের কথাও ভাবা হচ্ছে।
রিজার্ভ বর্তমানে ‘নিরাপদ অবস্থায়’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিময় হারে বড় ধরনের অবমূল্যায়ন এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক সতর্ক রয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম জোরদার করার কথাও জানান গভর্নর। দ্রুত নতুন ব্যবস্থাপনা নিয়োগ দেওয়া হবে এবং এ ব্যাংকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।
এছাড়া, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে দেশে একটি একক কিউআর কোড চালু করা হবে বলে জানান তিনি। ১ জুলাই থেকে এটি বাধ্যতামূলক হবে, যা ক্যাশলেস লেনদেন বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

