বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের সুস্থতা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। আর এই খাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক—যার নীতি, তদারকি ও কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার গতি ও ভারসাম্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দীর্ঘদিনের অনিয়ম, উচ্চ হারে খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রভাবের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত আজ চাপের মুখে। এর প্রভাব পড়ছে বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার ওপর।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ একটি দুর্বল কেন্দ্রীয় ব্যাংক কখনোই একটি শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি হতে পারে না। ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, খেলাপি ঋণ কমানো, সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ হারে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, মূলধনের ঘাটতি এবং দুর্বল তদারকির কারণে দেশের আর্থিক খাতের ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী, স্বাধীন ও কার্যকর কেন্দ্রীয় ব্যাংক গড়ে তোলা ছাড়া টেকসই সমাধানের কোনো বিকল্প নেই। তাই ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভীর ও সময়োপযোগী সংস্কার এখন শুধু প্রয়োজন নয়—অপরিহার্য।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ডভাবে বেড়ে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩০.৬০ শতাংশ। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল, তবে বছরের শেষে তা কিছুটা কমে এসেছে। এর আগে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ৩.৪৫ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছিল, যা মোট ঋণের ২০.২ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে, ২০২৩ সালের শেষের দিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১.৪৫ লাখ কোটি টাকা, যা এক বছরের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৪২ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ঋণ খেলাপি। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেশের ব্যাংকিং খাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি ও তদারকির জরুরি প্রয়োজন তুলে ধরে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সংস্কারের প্রয়োজন মূলত এই দীর্ঘদিনের দুর্বলতা ও সংকট থেকে উদ্ভূত। সাম্প্রতিক সময়ে খেলাপি ঋণের এই আশঙ্কাজনক বৃদ্ধি, লাগামহীন অর্থ পাচার এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংকিং খাতকে আরও চাপে ফেলেছে। ফলে শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাবও বড় সমস্যা। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে অনেক ব্যাংক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। ঝুঁকি-ভিত্তিক আধুনিক তদারকি ব্যবস্থা চালু করে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা এবং আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠন করাও জরুরি।
অন্যদিকে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে কার্যকর ও সময়োপযোগী মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা অপরিহার্য। তবে এসব পদক্ষেপ সফল করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্তভাবে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়িয়ে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের স্থিতিশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে তুলবে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ যে সংকটের মুখোমুখি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সীমিত স্বাধীনতা। বাস্তবে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় নীতিনির্ধারণ ও তদারকির ক্ষেত্রে কার্যকারিতা অনেকাংশেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়েছে, যা পুরো খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যাংক খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিস্তার। প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা তথাকথিত ‘মাফিয়া চক্রের’ প্রভাব অনেক ব্যাংকের ওপর বিস্তৃত হয়েছে, যার ফলে আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলো ক্রমেই সংকটে পড়ছে, অথচ কার্যকর আইন প্রয়োগ ও কঠোর পদক্ষেপের অভাবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ঋণ অনিয়মের কারণে সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। মানুষ তাদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
অন্যদিকে, ব্যাংক খাতের এই অব্যবস্থাপনার প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে, সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এবং অর্থনীতির সামগ্রিক গতি শ্লথ হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে নীতিমালা বাস্তবায়নে দুর্বলতা, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অনিয়ম ও তদারকির ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও ভঙ্গুর করে তুলেছে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। একটি শক্তিশালী ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্নীতির পথ বন্ধ করা এবং জবাবদিহিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক আর্থিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এই সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। মূলত আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও টেকসই পথে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ উল্লেখ করেছেন, দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক সংস্কার এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংস্কার এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি দাবি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, উচ্চ খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং ব্যাংক খাতের সুশাসনের অভাব দেশের অর্থনীতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় একটি শক্তিশালী, স্বায়ত্তশাসিত ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক গড়ে তোলা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। সংস্কারের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে, যা আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধিকে নিশ্চিত করবে। তাই বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সুস্থতা এবং দেশের সমৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গভীর ও সময়োপযোগী সংস্কার অপরিহার্য।

