বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বড় অঙ্কের পাওনা আদায় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের কাছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা ফেরত চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শরণাপন্ন হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড।
গতকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ। বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান, বোর্ড সদস্যরা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকের কাছে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। এই অর্থ দ্রুত ফেরত পাওয়ার জন্য গভর্নরের হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের কাছেও পাওনা থাকার বিষয়টি তুলে ধরা হয়।
এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স প্রণোদনা বাবদ পাওনাও দাবি করেছে ইসলামী ব্যাংক। বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আদায়ে সহযোগিতা এবং বিশেষ শর্তে প্রভিশনিংয়ে কিছুটা ছাড় দেওয়ার অনুরোধও জানানো হয়। বড় শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসা কীভাবে চালিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও গভর্নরের পরামর্শ চাওয়া হয়।
গভর্নর মোস্তাকুর রহমান এসব বিষয় গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, দ্রুত কীভাবে সহায়তা দেওয়া যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানো হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবসা পরিচালনায় কী ধরনের বাধা রয়েছে তা জানতে চাওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে বিষয়গুলো পর্যালোচনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পর্ষদের সদস্য মো. আবদুল জলিলকে অপসারণ করে তার স্থলে হিসাববিদ এস এম আবদুল হামিদকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পটভূমিতে রয়েছে ব্যাংকটির দীর্ঘদিনের বিতর্কিত অধ্যায়। ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই সময়ে ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নিয়মবহির্ভূতভাবে প্রায় ১০ হাজার কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। এ সময় শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা দেশত্যাগ করেন। নতুন পর্ষদে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় মো. আবদুল জলিলকে।
গভর্নরের সঙ্গে এটি ছিল ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডের দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে প্রথম বৈঠকে তিনি উল্লেখ করেন, একসময় ইসলামী ব্যাংক দেশের অন্যতম শক্তিশালী ব্যাংক ছিল। তবে মাঝখানে সুশাসনের ঘাটতি দেখা দেয়। ব্যাংকটিকে আবারও স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে বলে জানান তিনি।
ওই বৈঠকে আরও বলা হয়, অতীতে ব্যাংকটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন ছিল। বর্তমানে কোনো গোষ্ঠী, দল বা পরিবারের প্রভাবমুক্ত থেকে পরিচালিত হওয়াই লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপ তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন আটটি ব্যাংকের মধ্যে চারটি থেকে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে জালিয়াতির মাধ্যমে কাগুজে ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ৯৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা পাচারের তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংক থেকেই প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এসব ঋণ গ্রহণ করে।

