বাংলাদেশের শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি বড় সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে। প্রচলিত কলমানি মার্কেট থেকে তারা ঋণ নিতে পারে না। ফলে তারল্য সংকটে পড়লে দ্রুত অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে যায়। এই বাস্তবতা বদলাতে এবার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের মধ্যেই একটি ইসলামিক আন্তঃব্যাংক মানি মার্কেট চালুর পরিকল্পনা করেছে। এর মাধ্যমে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি সংগঠিত ও শরিয়াহসম্মত প্ল্যাটফর্ম পাবে।
বর্তমানে শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলো প্রচলিত কলমানি মার্কেটে অংশ নিতে না পারায় তারল্য সংকটে পড়লে চাপ বাড়ে। নতুন এই বাজার চালু হলে তারা বিকল্প উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারবে। এতে তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও কার্যকর হবে। এই বাজার শুধু পূর্ণাঙ্গ ইসলামিক ব্যাংকের জন্যই নয়, বরং যেসব প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামিক শাখা বা উইন্ডো রয়েছে, তারাও এতে অংশ নিতে পারবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করেছে। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও বাহরাইনের মতো দেশে ইসলামিক আন্তঃব্যাংক বাজারের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ১ দিন থেকে শুরু করে ৭, ১৪, ২৮, ৯০ ও ১৮০ দিনের জন্য লেনদেন করা যাবে। জামানতসহ এবং জামানত ছাড়া—উভয় ধরনের ঋণ সুবিধা থাকবে। এ বিষয়ে একটি নীতিমালার খসড়া ইতোমধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে ২০১১ সালে ইসলামিক ব্যাংকের জন্য অনুরূপ একটি উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফল হয়নি। নতুন করে নেওয়া এই পদক্ষেপকে খাতটির তারল্য পরিস্থিতি উন্নয়নের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতদিন আন্তঃব্যাংক প্ল্যাটফর্ম না থাকায় ইসলামিক ব্যাংকগুলো অনেক সময় শরিয়াহসম্মত কাঠামোর বাইরে গিয়ে অর্থ জোগাড় করতে বাধ্য হয়েছে। নতুন বাজার চালু হলে ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে অর্থ লেনদেন করতে পারবে, যা ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যেসব ব্যাংকের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকবে, তারা তা স্বল্পমেয়াদে অন্য ব্যাংককে দিতে পারবে। এতে অস্থায়ী তারল্য সংকট সহজেই সামাল দেওয়া যাবে। বর্তমানে উপযুক্ত আর্থিক যন্ত্রের অভাবে অনেক ইসলামিক ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেয় বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ সহায়তার ওপর নির্ভর করে।
একজন জ্যেষ্ঠ ব্যাংকার জানান, ইসলামিক ব্যাংকগুলো প্রচলিত ব্যাংক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেপো সুবিধা থেকে ঋণ নিতে পারে না। যদিও তারা সুকুকের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে, তবে এর পরিমাণ চাহিদার তুলনায় কম।
এখন পর্যন্ত তারল্য ব্যবস্থাপনায় ইসলামিক ব্যাংকগুলো বিভিন্ন পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। যেমন, ইসলামিক ব্যাংক লিকুইডিটি ফ্যাসিলিটি, যেখানে সুকুক জামানত হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। এছাড়া বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ডেও তারা বিনিয়োগ করে, যদিও বর্তমানে তহবিলের অভাবে এই কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির।
এ ছাড়া মুদারাবা ভিত্তিক আন্তঃব্যাংক আমানত ব্যবস্থাও রয়েছে, যেখানে লাভ ভাগাভাগির ভিত্তিতে অর্থ লেনদেন হয়। তবে প্রয়োজনের সময় এসব উৎস সবসময় যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, নতুন আন্তঃব্যাংক বাজার চালু হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই একটি সংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে তারল্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে ইসলামিক ব্যাংক খাতে তারল্যের চাহিদা ও সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করাও সহজ হবে।
নতুন ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো আরও নমনীয়ভাবে অর্থ ব্যবস্থাপনা করতে পারবে। যেমন, কোনো ব্যাংকের চলতি হিসাবে হঠাৎ ঘাটতি তৈরি হলে, তারা অন্য ইসলামিক ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিতে পারবে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নির্ভরতা কমবে। তবে নতুন বা দুর্বল আর্থিক অবস্থার ব্যাংকগুলোর জন্য শুরুতে চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে। অনেক ব্যাংক তাদের ঋণ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা নিয়ে শঙ্কায় থাকতে পারে, ফলে তারা সহজে অর্থ পেতে নাও পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উদ্যোগ স্বল্পমেয়াদি তারল্য সংকট মোকাবিলায় কার্যকর হলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। খাতের ভেতরে থাকা কাঠামোগত সমস্যা বা আর্থিক অনিয়মের মতো বিষয়গুলো আলাদাভাবে সমাধান করতে হবে।
তাদের মতে, সঠিক তদারকি ছাড়া যদি এই তহবিল দীর্ঘমেয়াদি সংকট মোকাবিলায় ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উল্টো ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।

