ইস্টার্ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার মনে করেন, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় সংকট আর তারল্য নয়। বরং উচ্চ হার করা খেলাপি ঋণই খাতকে ভিতর থেকে ক্ষয় করছে। তিনি বলেন, “সামগ্রিকভাবে শিল্পে তারল্যসংকট খুব বেশি নেই। কিছু ব্যাংকে সমস্যা থাকলেও মূল সমস্যা খেলাপি ঋণ। এটি শুধু ব্যাংকের লাভ নয়, পুরো অর্থনীতি এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশকেও প্রভাবিত করছে।”
বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেন, বাইরে থেকে ব্যাংকের আয় ও মুনাফা ভালো দেখায়, কিন্তু ভেতরে খেলাপি ঋণ ব্যাংককে ক্ষয় করছে। “এ কারণে প্রভিশন বাড়াতে হয়, লভ্যাংশ দেওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দেশের খেলাপি ঋণের হার এখনও আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা কমার প্রবণতা দেখা গেলেও সমস্যা এখনও বড়।”
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাফল্যের কারণ হিসেবে আলী রেজা ইফতেখার চারটি কৌশল উল্লেখ করেন সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ প্রস্তাবের সঠিক মূল্যায়ন, ঋণ বিতরণের পর নিয়মিত মনিটরিং এবং শক্তিশালী আদায় ব্যবস্থা। তিনি সতর্ক করে বলেন, “ঋণ দেওয়ার পর মনিটরিং না করলে ভালো গ্রাহকও খারাপ হয়ে যেতে পারে।”
বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতে কেওয়াইসি প্রক্রিয়া আরও কঠোর হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এখন যেভাবে-সেভাবে টাকা জমা রাখা যায় না। আমরা গ্রাহকের আয়ের উৎস যাচাই করি এবং ট্রানজাকশন প্রোফাইল বিশ্লেষণ করি।” বিদেশি ব্যাংকের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বোর্ডের ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। বোর্ডকে নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধ রেখে পেশাদার ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে ঋণ অনুমোদন দেওয়াই কার্যকর মডেল।
ঋণের ঝুঁকির আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন জমির মূল্য প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের আরও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এছাড়া ডলারের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। “ধীরে ধীরে ডলারের দাম সমন্বয় হলে এত বড় ধাক্কা লাগত না। আমদানি খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে।”
২০২৬ সালের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জিং হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অর্থনীতি স্থিতিশীল হতে সময় লাগে। এলডিসি থেকে উত্তরণে আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই রাখতে হবে, তবে আরও সময় নিয়ে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।” নতুন প্রজন্মের ব্যাংকারদের তিনি পরামর্শ দেন, “স্মার্ট চিন্তার পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রম প্রয়োজন। শর্টকাটে সফলতা আসবে না। নেতৃত্ব দিতে হলে ধৈর্য, দক্ষতা এবং পরিশ্রম জরুরি।”
ইস্টার্ন ব্যাংকের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে আলী রেজা ইফতেখার বলেন, অনেক সিনিয়র কর্মকর্তা অন্যান্য ব্যাংকের এমডি হয়েছেন। আবার ১৩ জন অবসর নিয়েছেন। “আমরা গর্বিত যে আমাদের ছেলেমেয়েরা দেশের ব্যাংকিং খাতকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কেউ কেউ আমাদের থেকেও ভালো করছে, এটিই আমাদের সফলতার প্রমাণ।”
২০০৭ সাল থেকে এমডি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া আলী রেজা ইফতেখার জানান, তার যোগদানের সময় ব্যাংকের মুনাফা ছিল ৪২ কোটি টাকা, যা বর্তমানে ৯০০ কোটি টাকার বেশি। আমানত বেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫৭ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ঋণ ছিল ২,৯০০ কোটি টাকা, এখন ৪৮ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকের আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ ৭২০ কোটি ডলার। তিনি সব সাফল্যকে বোর্ড, ম্যানেজমেন্ট এবং কর্মীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল হিসেবে দেখেন।
শেষে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করা। সঠিক নীতি, শক্তিশালী মনিটরিং এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা এ সংকট কাটিয়ে উঠতে পারব।”
আলী রেজা ইফতেখার ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিষয়ে গ্র্যাজুয়েট তিনি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট কমপ্লায়েন্সে বিশেষজ্ঞ। ২০১২ সালে তিনি ‘সিইও অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়েছেন এবং বেসরকারি ব্যাংক এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশেও নেতৃত্ব দিয়েছেন।

