দেশের ব্যাংক খাত ২০২৪ সালে বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়ে। বছরজুড়ে ১৭টি ব্যাংক নিট মুনাফা অর্জন করতে পারেনি। যারা মুনাফা করেছে, তাদের আয়ও প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতে। ফলে ব্যাংকগুলোর এই ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
আজ রোববার (৫ এপ্রিল) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএসআরবিষয়ক প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশের ৬১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে ৩৪৫ কোটি ৫ লাখ টাকা। আগের বছরের তুলনায় এ ব্যয় কমেছে ২৭০ কোটি ৯১ লাখ টাকা, যা প্রায় ৪২ শতাংশ হ্রাস নির্দেশ করে।
গত এক দশকের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন সিএসআর ব্যয়। এর আগে ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন ব্যয় ছিল ৫২৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। সেই তুলনায় এবারের ব্যয় প্রায় ১৮২ কোটি টাকা কম, যা খাতটিতে নতুন নিম্নমুখী প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে সিএসআর ব্যয় ছিল ৬১৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০৮ কোটি টাকা বা ৩৩ শতাংশ কম। ২০২৩ সালে ব্যয় ছিল ৯২৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালে ১,১২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ, দুই বছরে সিএসআর ব্যয় কমেছে ৫১৩ কোটি টাকার বেশি, যা ৪৫ শতাংশেরও বেশি পতন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাংকিং খাতে বড় ধাক্কা দেয়। একই সময়ে বিভিন্ন ব্যাংকের অনিয়ম, লুটপাট ও অর্থ পাচারের তথ্য প্রকাশ্যে আসে। এতে কাগজে-কলমে দেখানো মুনাফার বিপরীতে প্রকৃত আর্থিক অবস্থার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকায় প্রকৃত লোকসানের হিসাব সামনে আসে।
বিশেষ করে শরিয়াভিত্তিক কয়েকটি ব্যাংক বেশি চাপে পড়ে। এসব ব্যাংকে কিছু শিল্পগোষ্ঠীর ঋণ অনিয়ম ও অর্থ পাচারের প্রভাব স্পষ্ট হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নেয়।
ব্যাংকারদের মতে, সিএসআর ব্যয় কমার পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অতীতে বিভিন্ন খাতে অনুদান বা সহায়তার জন্য রাজনৈতিক চাপ থাকত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা নানা আয়োজনের নামে ব্যাংকগুলোকে ব্যয় করতে হতো।
অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় প্রকৃত সিএসআরের বাইরে চলে যেত। তবে ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর এ ধরনের চাপ কমেছে। ফলে ব্যাংকগুলো এখন তুলনামূলকভাবে বিবেচনা করে ব্যয় করছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সিএসআর খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অনেক সময় এই অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যায়, যা সামাজিক দায়বদ্ধতার মূল উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে তাদের নিট মুনাফার একটি অংশ সিএসআর খাতে ব্যয় করতে হয়। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ শিক্ষা, ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য এবং ২০ শতাংশ পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যয় করা যাবে।
তবে বাস্তবে এই নির্দেশনা পুরোপুরি মানা হচ্ছে না। ২০২৫ সালে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ ব্যয় করেছে ‘অন্যান্য’ খাতে। শিক্ষায় ব্যয় হয়েছে ২৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ, স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য অংশ গেলেও পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১১টি ব্যাংক সিএসআর খাতে কোনো অর্থ ব্যয় করেনি। এগুলো হলো জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
এছাড়া ২০২৪ সালে লোকসানে থাকা ব্যাংকের তালিকায় রয়েছেজনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, বেসিক ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
তবে লোকসানে থাকা ব্যাংকগুলোর মধ্যে ছয়টি প্রতিষ্ঠান সিএসআর খাতে ব্যয় করেছে। এগুলো হলো এবি ব্যাংক, ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, এনআরবিসি ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক।

