মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ প্রবৃদ্ধি কমাবে, মূল্যস্ফীতি বাড়াবে, দারিদ্র্য গভীর করবে, কর্মসংস্থান কমাবে এবং ঋণের চাপ বাড়াবে।
ঢাকায় আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক জানায়, “মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রভাবিত করবে এবং বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চ আমদানি ব্যয়, রপ্তানি দুর্বলতা এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ায় চলতি হিসাব ঘাটতি বাড়বে। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি এবং বিনিময় হারের ওপর চাপ মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়াতে পারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (FY26) দেশের প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে ৩.৯ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা আগের ৪.৬ শতাংশ পূর্বাভাসের তুলনায় কম। এটি যুদ্ধের প্রভাব এবং রপ্তানি খাতের দুর্বলতা ও বিনিয়োগে ধীরগতির ফল।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দারিদ্র্য ইতোমধ্যে টানা তিন বছর ধরে বাড়ছে। সংঘাত শুরুর আগে এ বছর প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার কথা থাকলেও এখন মাত্র ৫ লাখ মানুষ বের হতে পারবে। অর্থাৎ প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে থেকে যাবে। এছাড়া প্রায় ৬ লাখ কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কাও রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, মূল্যবৃদ্ধি দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ১০ শতাংশ দায়ী হবে, যা আয় বৈষম্য আরও বাড়াবে। ২০২৬ সালে গিনি সহগ ০.২ পয়েন্ট পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক হিসাবের সব প্রধান উপাদান—আমদানি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্স—চাপের মুখে পড়বে বলে জানায় বিশ্বব্যাংক। দেশের ৬০–৬৫ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৫৫–৬০ শতাংশ এলএনজি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। ফলে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি সরাসরি আমদানি ব্যয় বাড়াবে এবং বাণিজ্য ঘাটতি বড় করবে। রেমিট্যান্স প্রবাহ, যা জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ, মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে কমে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে দেশীয় জ্বালানি খরচও বাড়বে, যার ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং খাদ্য ও অখাদ্য উভয় খাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। আংশিকভাবে মূল্য সমন্বয় না হলে আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ০.৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়তে পারে। টাকার অবমূল্যায়নের চাপও বাড়বে, ফলে খাদ্য, জ্বালানি, সার ও শিল্পপণ্যের আমদানি ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে।
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও সার খাতে ভর্তুকি বাড়ায় সরকারের আর্থিক চাপ বাড়বে। ভর্তুকি জিডিপির ২.৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এতে উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হবে এবং সরকারকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে। ফলে ২০২৮ সালের মধ্যে সরকারি ঋণ জিডিপির ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে বিশ্বব্যাংক চারটি স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের সুপারিশ করেছে—
*মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ এবং অপ্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা বন্ধ
*কর সংস্কার ও জ্বালানি ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমিয়ে রাজস্ব বৃদ্ধি
*উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ
*ব্যাংক খাত সংস্কার ও খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠোর পদক্ষেপ
এছাড়া ব্যবসা পরিবেশ সহজ করা, ডিজিটাল লাইসেন্সিং, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, “দ্রুত ও সাহসী কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা টেকসই হবে না।”

