রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ দীর্ঘদিন ধরে আদালতে ঝুলে থাকায় ব্যাংক খাতের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। ছয়টি সরকারি ব্যাংকের প্রায় ৪৭ হাজার মামলায় আটকে রয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
অনুসন্ধান অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড এবং বেসিক ব্যাংক—এই ছয় ব্যাংকের মোট ৪৭ হাজার ৭১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এতে তারল্য সংকট বাড়ছে এবং নতুন করে ঋণ বিতরণেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ব্যাংকভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনতা ব্যাংকে সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা মামলায় আটকে আছে। সোনালী ব্যাংকে এই পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকে ১৭ হাজার কোটির বেশি। রূপালী ব্যাংক, বিডিবিএল ও বেসিক ব্যাংকেও হাজার হাজার কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে আদায় হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অর্থ মূলত আমানতকারীদের টাকা, যা ঋণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছিল। সময়মতো তা ফেরত না আসায় ব্যাংকগুলোর তারল্য ও স্থিতিশীলতায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে।
মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, দীর্ঘসূত্রতায় ঋণ মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকছে, যা ব্যাংক খাতকে একটি জটিল সংকটে ফেলেছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে বিশেষ আদালত গঠন, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বাড়ানো এবং দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
একইভাবে সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা মামলায় আটকে থাকায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই অর্থ দ্রুত আদায় করা না গেলে আমানত ফেরত দিতেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, খেলাপি ঋণকে সাধারণ সমস্যা হিসেবে না দেখে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তিতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা। সার্বিকভাবে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর এই বড় অঙ্কের ‘মন্দ ঋণ’ দ্রুত আদায় করা না গেলে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

