বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে যার নাম বাদ দিয়ে লেখা যায় না, তিনি আলী রেজা ইফতেখার। ২০০৭ সাল থেকে দীর্ঘ ১৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি (ইবিএল)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার পথচলা কেবল একটি পেশাদারী রেকর্ড নয়, বরং এটি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বৈশ্বিক মানদণ্ডে উন্নীত করার এক মহাকাব্যিক রূপান্তর।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে কোনো পেশাদার ব্যাংকারের একক কোনো প্রতিষ্ঠানে এত দীর্ঘ সময় শীর্ষ পদে আসীন থাকার নজির বিরল। তার এই দীর্ঘমেয়াদী নেতৃত্ব প্রমাণ করে যে, সঠিক দূরদর্শিতা এবং নিষ্ঠা থাকলে একটি দেশীয় ব্যাংককেও আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডে রূপান্তর করা সম্ভব।
সাফল্যের পরিসংখ্যান: ৪২ কোটি থেকে ৯০০ কোটির বিস্ময়কর উত্থান
আলী রেজা ইফতেখারের অধীনে ইবিএল-এর আর্থিক প্রবৃদ্ধি এক কথায় বিস্ময়কর। ২০০৭ সালে যখন তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা ছিল মাত্র ৪২ কোটি টাকা এবং সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪,২৫৭.৯ কোটি টাকা। তার সুনিপুণ পরিচালনায় বর্তমানে ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফা ৯০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আমানতের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭ হাজার কোটি টাকায় এবং ঋণের পোর্টফোলিও ২,৯০০ কোটি টাকা থেকে উন্নীত হয়েছে ৪৮ হাজার কোটি টাকায়। বর্তমানে ইবিএল-এর বার্ষিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ ৭২০ কোটি ডলার, যা দেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকটির বিশাল প্রভাবের স্বাক্ষর বহন করে।
ব্যাংকিংয়ের ‘ক্যানসার’ নির্মূলে ইফতেখার কৌশল
ইফতেখার মনে করেন, বর্তমান ব্যাংকিং খাতের প্রধান সংকট তারল্য নয়, বরং উচ্চ খেলাপি ঋণ—যাকে তিনি ‘ক্যানসারের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই ক্ষত ভিতর থেকে খাতটিকে ক্ষয় করে লভ্যাংশ এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সংকট মোকাবিলায় তিনি ইবিএল-এ চারটি বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করেছেন: সঠিক গ্রাহক নির্বাচন, ঋণ প্রস্তাবের নিখুঁত মূল্যায়ন, বিতরণের পর কঠোর মনিটরিং এবং শক্তিশালী আদায় ব্যবস্থা। এই শৃঙ্খলার কারণেই বিগত ৩০ বছরে ইবিএল-এর গড় খেলাপি ঋণের হার মাত্র ৩ শতাংশের কাছাকাছি রাখা সম্ভব হয়েছে।
নেতৃত্বের দর্শন: নৈতিকতা ও সুশাসনের সংমিশ্রণ
আলী রেজা ইফতেখার বরাবরই বিশ্বাস করেন যে, মুনাফা কোনো ব্যবসার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না; বরং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী মূল্যবোধ থেকেই টেকসই মুনাফা আসে।
তার মতে, একটি কার্যকর ব্যাংকিং মডেলে পরিচালনা পর্ষদের কাজ নীতিনির্ধারণ করা, আর পেশাদার ম্যানেজমেন্ট সেই নীতির ভিত্তিতে কাজ করবে—এটাই তার সাফল্যের মূল মন্ত্র। স্টিভ জবস দ্বারা অনুপ্রাণিত এই নেতা সবসময় উদ্ভাবনে বিশ্বাস করেছেন। তার বিখ্যাত স্লোগান— “ইবিএল-এ আমরা চাকরি দিই না, ক্যারিয়ার গড়ি”—আজ দেশের ব্যাংকিং খাতে একটি আদর্শ। ইবিএল থেকে তৈরি হওয়া দক্ষ ব্যাংকাররা আজ দেশের অন্তত ১৩টি ব্যাংকের শীর্ষ পদে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা তার মানবসম্পদ উন্নয়নের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি।
ডিজিটাল রূপান্তরের জাদুকর ও আধুনিক ব্যাংকিং
ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রপথিক হিসেবে তিনি ইবিএল-কে দেশের অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল ব্র্যান্ডে পরিণত করেছেন। অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম এবং ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বিনির্মাণে তার উদ্ভাবনী চিন্তা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স ব্যাংকিং তাকে ‘দ্রুততম প্রবৃদ্ধিশীল ডিজিটাল ব্যাংক ২০২১’ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।
তিনি মনে করেন, এলডিসি থেকে উত্তরণ এবং পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে হলে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। নতুন প্রজন্মের ব্যাংকারদের প্রতি তার স্পষ্ট বার্তা—শর্টকাটে কোনো সফলতা নেই; নেতৃত্ব দিতে হলে ধৈর্য, কঠোর পরিশ্রম এবং স্মার্ট চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে হবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও শিল্পের ওপর প্রভাব
আলী রেজা ইফতেখারের মুকুটে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য দেশি-বিদেশি পালক। কোটলার ইমপ্যাক্ট কর্তৃক দেশের সর্বপ্রথম ‘সিইও অফ দ্য ইয়ার’ এবং এশিয়ান লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডে ‘সিইও অফ দ্য ইয়ার ২০১২’ তার উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি। তার নেতৃত্বে ইবিএল টানা বহু বছর ‘ইউরোমানি’, ‘এশিয়ামানি’ এবং ‘দি এশিয়ান ব্যাংকার’ কর্তৃক বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যাংকের মর্যাদা লাভ করেছে। দুই মেয়াদে অ্যাসোসিয়েশন অফ ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার প্রাজ্ঞ পরামর্শ গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করেছে।
পরিশেষে, আলী রেজা ইফতেখার কেবল একজন ব্যাংকের এমডি নন; তিনি আধুনিক বাংলাদেশের ব্যাংকিং স্থাপত্যের এক সার্থক কারিগর। ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যখন এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তিনি ইবিএল-কে সেই যাত্রার প্রধান অংশীদার হিসেবে প্রস্তুত করে রেখেছেন। সততা, প্রজ্ঞা এবং নৈতিক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে শ্রেষ্ঠত্বের শিখরে নিয়ে যাওয়া যায়, তিনি তার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

